সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছে এক অদ্ভুত মতবাদ। সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমারা বিশ্বময় মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারিবারিক বন্ধনগুলোকে বিনষ্ট করে দিতে চায়। প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় মুসলমানদের ধর্মীয় আদর্শকে। যুগ যুগ ধরে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এরই অংশ হিসাবে বর্তমানে তারা ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ নামে এক বিচিত্র মতাদর্শের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এটিকে ‘জেন্ডার আইডেন্টিটি’ বা লিঙ্গ পরিচয় মতবাদও বলে থাকে। পশ্চিমারা এই মতবাদ প্রবল আগ্রহে লালন করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দল ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই মতবাদ প্রচারে কাজ করে চলেছে। আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানের এক্সিকিউটিভ নির্দেশ, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় আইন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পলিসিও ঠিক হচ্ছে এই নতুন মতবাদের আলোকে। অসম্ভব অশ্লীল মতাদর্শটি তারা নাগরিক ও মানবাধিকারের নামে গোটা বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত। জাতিসংঘসহ পশ্চিমাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান এর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে যাচ্ছে। ২০১৯ সালে ইন্ডিয়াতে ও ২০১৮ সালে পাকিস্তানের সংসদে ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্ট চূড়ান্তভাবে পাশ করা হয়। বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডার আইনটি পাশ করার জন্য জাতিসংঘ ও তাদের ফান্ডে পরিচালিত স্থানীয় এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শরীফ শরীফার গল্পের নামে বাংলাদেশের শিক্ষা সিলেবাসে এ মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। বামপন্থী অনেক সুশীল ও কথিত বুদ্ধিজীবীরা এর জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাধাহীন ভাবে। এ সময়ের বিষয়টির ব্যাপারে সম্যক ধারণা অর্জন করা ও সকল মহলকে এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে এ ঘৃণ্য প্রবণতাকে থামিয়ে দিতে না পারলে দেশ ও মানবতার চরম ক্ষতি সাধিত হবে।
এলজিবিটি ও ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের পরিচয়:
১৯৮০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে LGBTQ (এলজিবিটি) আন্দোলন। মূলত এটি চারটি শব্দের আদ্যাক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত। যথা: L- Lesbian সমকামী নারী। G- Gay সমকামী পুরুষ। B- Bisexual উভয়কামী। T-Transgender রুপান্তরিত লিঙ্গ।
উল্লেখিত বিশ্লেষণ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, এলজিবিটি বস্তুত নারী পুরুষের অবাধ যৌনতা ও সমকামিতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তারা বিশ্বময় যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায় তা কোন ধর্ম ও সভ্যতা মেনে নিতে পারে না। বর্তমানে তারা এ চারটি আদ্যাক্ষরের সাথে Q আদ্যাক্ষর যুক্ত করে থাকে। Q- Queer বিচিত্র লিঙ্গ আকর্ষণ। ট্রান্সজেন্ডার পরিভাষাটি এলজিবিটিকিউ তথা সমকামী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আরও পূর্বে ১৯৬৫ সালে প্রথম ব্যবহৃত হয়।
মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকে ট্রান্সজেন্ডার তথা জেন্ডার আইডেন্টিটি শব্দটি একটি গোষ্ঠী বা আম্ব্রেলা টার্ম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটা নন-বাইনারি ও এলজিবিটি-এর সমর্থক শব্দ। ১৯৬৫ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সাইক্রিয়াটিস্ট প্রফেসর John F. Oliven ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। এটা Transsexualismus জার্মান শব্দ হিসেবে ১৯২৩ সালে প্রথম প্রবর্তন হয়। এরপর এই শব্দের বিবর্তন ঘটে Transsexual হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ছিল। শুরুর দিকে ট্রান্সজেন্ডার বলতে যারা লিঙ্গ পরিবর্তন করতে হরমোন ও সার্জারির আশ্রয় নিত, তাদেরকে বোঝানো হত। ট্রান্সজেন্ডারের সংজ্ঞা এখন অনেক ব্যাপক; এমনকি ক্রসড্রেসার তথা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক ও বেশভূষা গ্রহণ করতে আগ্রহীদেরকেও বুঝায়।
-ট্রান্সজেন্ডারিজম মতবাদ এবং বিশ্ব প্রেক্ষাপট, ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, পৃষ্ঠা: ৭-৮
ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের মৌলিক দর্শন:
এ মতবাদের প্রকৃত ধারণা হলো, কোন পুরুষের যদি নিজেকে নারী বলে মনে হয়, তাহলে সে একজন নারী। সে শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক হলেও, একাধিক সন্তানের বাপ হলেও, আইন ও সমাজ তাকে নারী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কোন নারীর নিজেকে পুরুষ মনে হলে, নিজেকে পুরুষ বলে দাবি করলে, সে পুরুষ। যদিও তার মাসিক হয়, সে গর্ভবতী হয়, শারীরিকভাবে সে হয় সম্পূর্ণ সুস্থ। রাষ্ট্র সমাজ তাকে পুরুষ বলে স্বীকৃতি প্রদান করতে বাধ্য। এটা বর্তমানে বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বা মেডিক্যাল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না; মনের ইচ্ছাধীন বিষয়। অর্থাৎ যে কেউ যে কোনো সময় নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার ঘোষণা দিতে পারে। যেদিন থেকে কারো মনে হয় যে, সে জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ে আগ্রহী বা বিশ্বাসী নয়, সেদিন থেকে নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দিতে পারে। তাকে হরমোন ট্রিটমেন্ট আর বিভিন্ন অপারেশনের মাধ্যমে নিজের শরীরকে বদলে ফেলার অধিকার দিতে হবে। আর বাহ্যিক পরিবর্তন সাধন না করেও শুধুমাত্র মানসিক আকাঙ্ক্ষার কারণে সে মন মতো লিঙ্গ পরিচয়ে জীবনযাপনের অধিকার লাভ করবে।
ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের মৌলিকদাবিগুলো হল:
১. জন্মগত দেহ যা-ই হোক না কেন, নিজেকে যে নারী দাবি করবে তাকে নারী হিসেবে মেনে নিতে হবে, নিজেকে যে পুরুষ দাবি করবে তাকে মেনে নিতে হবে পুরুষ বলে, আইনী ও সামাজিকভাবে।
২. মানুষ ইচ্ছে মতো পোশাক পরবে, ইচ্ছে মতো ঔষুধ আর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বদলে নেবে নিজের দেহকে। আর কেউ যদি অস্ত্রোপচার না করেই নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের বলে দাবি করে, তাও মেনে নিতে হবে মুখ বুজে।
৩. রাষ্ট্র ও সমাজ কোনো বাধা দিতে পারবে না, বরং ‘সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী’ হিসাবে এ ধরনের মানুষকে দিতে হবে বিশেষ সুবিধা। সেই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একদম ছোটবেলা থেকে সবাইকে শেখাতে হবে যে, মানুষের মনটাই গুরুত্বপূর্ণ; দেহ না।
৪. একজন মানুষ পুরুষ নাকি নারী তার সাথে দেহের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষের দেহ তার পরিচয় ঠিক করে না। পরিচয় নির্ভর করে মানুষের মনের উপর। একজন মানুষ নিজেকে যা মনে করে সেটাই তার পরিচয়।
দাবি বাস্তবায়নে ট্রান্সজেন্ডারবাদের কৌশলী যুক্তি ও তার জবাব:
তাদের দাবিগুলো কার্যত উদ্ভট ও অবাস্তব মনে হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রণীত ট্রান্সজেন্ডার আইন, তাদের বিভিন্ন আর্টিকেল, বক্তব্য ও প্রবন্ধ অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় তারা এসব আজগুবি দাবি প্রচার ও বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা তাদের এসব আজগুবি দর্শন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য কিছু কৌশলী যুক্তি উত্থাপন করে থাকে।
প্রথম যুক্তি: যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা:
তাদের ধারণা মতে, সমাজে অনেক নারী আছে যারা নিজেদেরকে পুরুষের মতো বলে মনে করে। নারীত্ব তাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। পুরুষের মতো পোশাক পরিচ্ছেদ পরিধান করতে, পুরুষের মতো আচরণ ও চালচলন তাদের ভালো লাগে। নিজে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও নারীর প্রতি অনেকের কোন আগ্রহ থাকে না। তারা আরেকজন পুরুষকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চায়। অনেক নারীদের ক্ষেত্রেও এমনটি পরিলক্ষিত হয়। তারা নিজেদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে না। তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে গেলে সমাজে, পরিবারে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। এ কারণে তারা নিজেদেরকে অসহায় ও নির্যাতিত মনে করে। সামাজিকভাবে তাদের এ আকাঙ্ক্ষার অধিকার বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। না হয় তাদের উপর অন্যায় করা হবে।
উল্লেখিত যুক্তির খণ্ডন:
শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ একজন পুরুষ নিজেকে নারী মনে করতে থাকা এবং পূর্ণ সুস্থ একজন নারী নিজেকে পুরুষ বলে দাবি করা সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিরোধী। তাদের এ প্রত্যয় স্বীকার করে নেয়ার অর্থ হল, নিশ্চিত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা। বাস্তবতা পরিপন্থি তাদের এ মনে হওয়াটা বস্তুত তাদের মনের সমস্যা। এটি একটি মানসিক রোগের মত। তাদের এ অবাস্তব ও উদ্ভট ধারণা সংশোধন করা প্রয়োজন। তাদের মানসিক বিকৃতির চিকিৎসা না করে উল্টো সামাজিকভাবে অন্যায় আকাঙ্ক্ষাকে বৈধতা দেয়ার দাবি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। অনেক মানুষের মনেই এ ধরণের অন্যায় প্রত্যয়ের সৃষ্টি হয়। অন্যের শরীর ও সম্পদের উপরও এ ধরনের অন্যায় চাহিদা থাকতে পারে। যা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া আইন ও মানবিক বিবেচনায় সিদ্ধ নয়। অনেকের মনে অসম্ভব হাস্যকর চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন, জার্মানির বার্লিন পটসামের প্লাটজ রেলপথ স্টেশনে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রায় ১০০০ মানুষ জড়ো হয়েছিল। যারা নিজেদেরকে ‘কুকুর’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে এবং তারা সেখানে একে অপরের সাথে চিৎকার বা ঘেউ ঘেউ করে যোগাযোগ করছিল। নিউ ইয়র্ক পোস্ট, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ডেইলি মেইল, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
এখন তাদেরকে কুকুর বলে পরিচয় দিতে পারার দাবি উত্থাপন করা হাস্যকর নয় কি? এসব বস্তুত তাদের মানসিক সমস্যা। অ্যানোরেক্সিয়া Anorexia এক ধরনের মানসিক রোগ রয়েছে। এর কারণে খাওয়ার আগ্রহ চরমভাবে কমে যায়। সব সময় ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয় হয়। এ ধরনের রোগী বিপজ্জনক রকমের আন্ডারওয়েট হলেও নিজেকে মোটা মনে করে। তাদের এ ধারণা কি মেনে নেওয়া উচিত? নাকি তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন?
বডি আইডেন্টিটি ইন্টেগ্রিটি ডিসঅর্ডার নামে একটা মানসিক রোগ আছে। এ ধরনের রোগী মনে করতে শুরু করে যে তার শরীরের কোন একটা অংশ আসলে তার না। হয়তো নিজের একটি পা তার কাছে অপরিচিত লাগতে শুরু করে। তখন সে ওই পা কেটে ফেলে দিতে চায়। শারীরিকভাবে তার কোন সমস্যা নেই, শরীরের যে অংশটা তারা বাদ দিতে চাচ্ছে সেখানেও কোন সমস্যা নেই। সমস্যাটা তাদের মনে। এক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা বিজ্ঞানী বা কোন বুদ্ধিমান মানুষ তাদের এই চাহিদা বাস্তবায়নের স্বপক্ষে বলবে না। অথচ ট্রান্সজেন্ডারবাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করলে তাদের এ দাবি মেনে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বরং এ প্রবণতায় ভোগা মানুষদের মানসিক সংশোধনের প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে তাদেরকে এ অন্যায় আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
দ্বিতীয় যুক্তি: হিজড়া ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার:
ট্রান্সজেন্ডারবাদকে অনেকে হিজড়া ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করতে চায়। অনেক দেশে হিজড়ারা সামাজিক ও পারিবারিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ট্রান্সজেন্ডারবাদীরা মানুষকে প্রতারিত করতে তাদের এ অশ্লীল মতাদর্শকে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার প্রতিষ্ঠার দর্শন বলে প্রচার করে।
উপরোক্ত যুক্তির খণ্ডন:
পূর্বের বিশ্লেষণ থেকে আমরা পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে পেরেছি যে, ট্রান্সজেন্ডার বলতে ওই সমস্ত নারী-পুরুষদের বুঝায়, যারা শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে বিপরীত লিঙ্গের বলে দাবি করে। আর হিজড়ারা এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যাদের দেহ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি তারা পুরুষ। যাদের দেহ ডিম্বাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি তারা নারী। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ আছে যাদের প্রজনন ব্যবস্থা এবং যৌন বিকাশের ত্রুটি থাকে। জন্মগতভাবে তাদের দেহে নারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ দেখা যায়। এ ধরনের মানুষ বুঝাতে যে শব্দটা ব্যবহৃত হয় তা হলো ইন্টারসেক্স (Intersex) বা আন্তঃলিঙ্গ। আমাদের বাংলাদেশে এদেরকে সাধারণত ‘হিজড়া’ বলা হয়। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী জনসংখ্যার মাত্র ০.০১৮% মানুষ হিজড়া। বাকি ৯৯.৯৮২% মানুষ স্বাভাবিক শরীর নিয়ে জন্ম নেয়। তারা হয়তো পুরুষ, না হয় নারী তবে সামান্য ত্রুটিযুক্ত। এটি বস্তুত এক ধরনের অসুস্থতা। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী এ ধরনের ত্রুটি অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করণের সুযোগ থাকলে তা করার অবকাশ রয়েছে। মানব সন্তান হিসাবে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা ইসলাম নিশ্চিত করেছে। তাদেরকে কোন অবস্থাতেই পরিবার ছিন্ন করা কিংবা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা কাম্য নয়। এ বিষয়ে আমাদের সামনে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার মনে রাখতে হবে যে, সমকামিতা ও অশ্লীলতার আকাঙ্ক্ষা লালনকারী বিকৃত ট্রান্সজেন্ডারবাদ ও হিজড়া সম্প্রদায় এক নয়। ট্রান্সজেন্ডারকে হিজড়া বলে চালিয়ে দেয়া পরিষ্কার প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
বিশ্বময় সচেতন মহলে ট্রান্সজেন্ডারবাদ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে:
ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সচেতন ও রুচিশীল মহল ট্রান্সজেন্ডারবাদকে অযৌক্তিক, পাগলামি চিন্তাধারা বলে আখ্যায়িত করে এ মতাদর্শ প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়েছে।
খোদ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ঘোষণা দিয়েছেন, কেউ চাইলেই লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে না। দৈনিক প্রথম আলো, ০৬ অক্টোবর ২০২৩।
রাশিয়ার সর্বোচ্চ আদালত ‘আন্তর্জাতিক এলজিবিটি পাবলিক মুভমেন্ট’কে একটি চরমপন্থী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং দেশজুড়ে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। বিবিসি, ৩০ নভেম্বর ২০২৩; সিএনএন, ৩০ নভেম্বর ২০২৩; দ্যা গার্ডিয়ান, ৩০ নভেম্বর ২০২৩।
ফেব্রুয়ারিতে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে রঙধনু পতাকা বিতরণের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্যা ডিপ্লোমেট, ২৮ এপ্রিল ২০২৩; নিউ ইয়র্ক টাইমস্, ৩ জুন ২০২৩।
উগান্ডায় সমকামিতা আগে থেকেই অবৈধ ছিল। কিন্তু মে মাসে নতুন আইনের মাধ্যমে এর শান্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক উগান্ডার নতুন ঋণ স্থগিত করেছে। বিবিসি নিউজ, ৯ আগস্ট ২০২৩; রয়টার্স, ৯ আগস্ট ২০২৩।
মালয়েশিয়ায় সমকামিতা নিষিদ্ধ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মে মাসে দেশের ১১টি শপিং মলের সোয়াচ স্টোরে এলজিবিটি উপাদান সম্বলিত টাইমপিস উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেউ এ ধরণের সামগ্রী মুদ্রণ, আমদানি, উৎপাদন করলে … অথবা কারো কাছে এ ধরনের সামগ্রী পাওয়া গেলে তার ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। আর কেউ এ ধরণের ঘড়ি পরলে বা বিতরণ করলে তার ২০ হাজার রিঙ্গিত জরিমানা হতে পারে। – দ্যা গার্ডিয়ান, ১০ আগস্ট ২০২৩।
কাতার ফুটবল বিশ্বকাপে ট্রান্সজেন্ডারদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিএনএন, ১৯ নভেম্বর ২০২২; দ্যা গার্ডিয়ান, ১৩ মে ২০২২।
১৯ মে ২০২৩ শুক্রবার পাকিস্তানের ফেডারেল শরীয়ত কোর্ট (এফএসসি) কোনো ব্যক্তি ইচ্ছামতো তার লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারবে না এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) আইন, ২০১৮-এর কয়েকটি ধারা শরীয়া পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছে।
ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির (অধিকার সুরক্ষা) আইন, ২০১৮ পাশের পর সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে দায়ের করা পিটিশনের জবাবে আদালত এই রায় প্রদান করে।
বিস্তারিত রায়ে বলা হয়েছে, আমরা এই উপসংহারে পৌঁছেছি যে, কুরআন ও সুন্নাহর ইসলামী বিধান অনুসারে একজন ব্যক্তির লিঙ্গ তার জৈবিক লিঙ্গের অধীন। সুতরাং একজন ব্যক্তির লিঙ্গ অবশ্যই তার জৈবিক লিঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।… রায়ে আরো উল্লেখ করা হয় যে, আমরা লক্ষ্য করেছি, ধারা-২ (এন) ও ইমপ্লিমেন্টেড অ্যাক্টের পাঁচটি ভিন্ন পরিভাষা; যথা (১) উভলিঙ্গ, (২) নপুংসক (৩) রূপান্তরকামী পুরুষ, (৪) রূপান্তরকামী নারী এবং (৫) খাজাসিরা ব্যক্তিদেরকে ‘হিজড়া ব্যক্তি’র একই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ উভলিঙ্গ, নপুংসক ও খাজাসিরা শব্দগুলো কোনো ব্যক্তির যৌন বৈশিষ্ট্যের জৈবিক বৈচিত্রকে বোঝায়, যা পুরুষ বা মহিলা শ্রেণীবিন্যাসের সাথে খাপ খায় না। অন্যদিকে রূপান্তরকামী পুরুষ ও রূপান্তরকামী নারী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যার স্ব-অনুভূত লিঙ্গ পরিচয় তাদের জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ বা জৈবিকভাবে তাদের লিঙ্গ থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। ডন, ১৯ মে ২০২৩।
উল্লিখিত তথ্যগুলো প্রমাণ করে ইতোমধ্যেই বিশ্বের সচেতন মহল ও নেতৃবৃন্দের কাছে ট্রান্সজেন্ডারবাদ চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কাজেই যুক্তি ও সভ্যতা পরিপন্থী এ মতাদর্শ কুচক্রী মহল আমাদের দেশের উপর যেন চাপিয়ে দিতে না পারে সে বিষয়ে ওলামায়ে কেরাম ও সচেতন বাংলাদেশী নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ট্রান্সজেন্ডারবাদের পর্যালোচনা:
নারী ও পুরুষের মানসিকতা, মেধা, দৈহিক অবকাঠামো, শক্তি-সামর্থ্য ও চলন-বলনের মাঝে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।
নারী-পুরুষের মাঝে এই ব্যবধান বাস্তবতার আলোকে স্বীকৃত। মানব সমাজের প্রতিটি স্থানে প্রত্যেকের অবস্থা ও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের জন্য পৃথক কর্মপদ্ধতি ও নিয়ম-নীতি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। শিক্ষা, আবাসন ও অবস্থানের জন্য তাদের আলাদা প্লাটফর্ম প্রস্তুত করা হয়।
এর ওপর ভিত্তি করেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ মহাজগতের সবকিছু সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে আবর্তিত হয়ে চলেছে। ট্রান্সজেন্ডারবাদ মেনে নেয়ার অর্থ হল, নারী-পুরুষের এই ব্যবধান উঠিয়ে দেয়া। এর দ্বারা অনেক ধরণের অসুবিধা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
বস্তুত ট্রান্সজেন্ডারবাদ এতটাই অসার ও অযৌক্তিক যে, এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র; বরং গোটা পৃথিবীতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন প্রভাবিত হওয়ার পাশাপাশি তার সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের আচার-ব্যবহার নিয়েও জটিলতা তৈরি হবে। কেননা, মহল্লার একটি ছেলে যখন সবার সামনে বেড়ে ওঠে। এলাকার সমবয়সী অন্যান্য ছেলেদের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। এলাকার বড় ভাই, মুরব্বি ও অন্যান্য লোকজনের সাথে তার একটা যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি হয়। সবাই তাকে একটি ছেলে হিসাবেই তার সাথে ব্যবহার করে। এখন হঠাৎ করে যদি এই ছেলেটি নিজেকে মেয়ে মনে করার কারণে তাকে মেয়ে বিবেচনা করতে হয়, তাহলে তার এতোদিনের বন্ধু-বান্ধব, মুরব্বি ও অন্যান্য লোকজনের সাথে সম্পর্কের অবস্থা কী দাঁড়াবে? সে বিবাহিত হয়ে থাকলে তার স্ত্রী সন্তানের অবস্থা কী হবে?
আর যদি কারো অসৎ উদ্দেশ্য থাকে কিংবা কেউ তার কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এমনটি করে থাকে, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা তো হবে আরো ভয়াবহ। যেমন, কোনো অসাধু ছেলে যদি কোনো মেয়ের সাথে প্রতারণা করে। তার সাথে সম্পর্কে জড়ায়। কৌশলে তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয় এবং তাকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। এরপর মেয়েটি বিয়ের জন্য চাপ তৈরি করলে ছেলেটি নিজেকে মেয়ে দাবি করে বসল এবং মেয়েটির নামে থানায় নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিল। তাহলে এর মীমাংসার কোনো পথ বা উপায় কি কেউ একটু বাতলে দিতে পারবেন?!
মোটকথা, কোনো ছেলে বা মেয়ে যখন তখন নিজেকে বিপরীত লিঙ্গের মনে করলেই যদি তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপরীত লিঙ্গের বলে মেনে নিতে হয়, তাহলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপর্যয় কোন্ স্তরে গিয়ে পৌঁছবে, কেউ কি তা একটু ভেবে দেখেছেন?
ট্রান্সজেন্ডার বাস্তবায়নকারী দেশগুলোতে বাস্তবেই এ ধরনের একাধিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে খুনের দায়ে ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ২৭ বছর বয়সী আসামি ডেমিট্রিয়াস মাইনর। ৯ বছর জেল খাটার পর সে হঠাৎ করে নিজেকে মহিলা বলে দাবি করে। তাকে ট্রান্স নারী বলে আখ্যায়িত করে মহিলা কারাগারে রাখার পর তার দ্বারা সেখানে দুইজন নারী সহবন্দি গর্ভবতী হওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি কারাগারে স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়। – ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ, আসিফ আদনান: পৃ. ১১।
কেউ হয়তো বলবেন, কারা কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল, ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য পৃথক সেলের ব্যবস্থা করা। আচ্ছা, মেনে নিলাম এটিও একটি সহজ ব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হল, ট্রান্সজেন্ডারদের সবাইকে যদি পৃথক সেলেই রাখা হয়, তাহলে কি এতে ট্রান্সজেন্ডারবাদের প্রতিষ্ঠা হল? কারণ ট্রান্সজেন্ডারবাদের দাবি তো হল, কোনো ছেলে নিজেকে মেয়ে মনে করলে তাকে মেয়ে হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর কোনো মেয়ে নিজেকে ছেলে মনে করলে তাকে ছেলে বিবেচনা করতে হবে। তাহলে বাস্তবে তো তাদের দাবি মানা হল না। তাদেরকে বরং তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করা হল। তাহলে আদৌ কি ট্রান্সজেন্ডারবাদকে যুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
শারীরিক গঠন, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও মন-মানসিকতায় নারীর পক্ষে কখনও পুরুষের সমান হওয়া সম্ভব নয়। এছাড়াও মেয়েদের রয়েছে বহুবিধ দুর্বলতা। এতকিছুর পরও একজন মেয়ে নিজেকে ছেলে দাবি করলে বা মনে করলেই সে ছেলে হয়ে যেতে পারে না। এমনকি সার্জারি করে ছেলেদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করলেও এবং হরমোনের পাওয়ারফুল ঔষধ সেবনের পরও তার পক্ষে ছেলের সমান হওয়া সম্ভব নয়। অনুরূপভাবে একজন ছেলে সার্জারির মাধ্যমে মেয়েদের সকল অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে নিলেও সে মেয়ে হয়ে যায় না। আর এ কারণেই দেখা যায়, ট্রান্স নারীর সাথে সাধারণ নারীরা পেরে উঠতে পারে না। যেমন, আউট স্পোর্টস নামের একটি ওয়েব সাইটে ২৩ জন ট্রান্স নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
যারা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মেয়েদের ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে জয়ী হয়েছে। আউট স্পোর্টস, ৬ আগস্ট ২০২১।
এ কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একজন ট্রান্স নারী নারীদের ইভেন্টে অংশগ্রহণ করলেও বাস্তবে সে তো পুরুষ। তাই সাধারণ নারীরা তার সাথে পেরে উঠবে কীভাবে? ফলে স্বাভাবিকভাবেই মহিলা ইভেন্টে ট্রান্স নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আর ট্রান্স নারীদেরকে নারী বলে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে অন্যান্য নারীদের উপর অন্যায় করা হয়েছে। এসব বিষয় প্রমাণ করে কখনোই যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ট্রান্সজেন্ডারবাদ মেনে নেয়া ও বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর নয়।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ট্রান্সজেন্ডারবাদের পর্যালোচনা:
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ট্রান্সজেন্ডারবাদ একটি স্পষ্ট কুফরি ও অভিশপ্ত মতবাদ। এতে সৃষ্টির বিকৃতি ও শরীয়তের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন বিদ্যমান। এছাড়াও এটি সাধারণ রীতি-প্রকৃতি ও ইসলামের সুমহান আদর্শ পরিপন্থি একটি মতবাদ। মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি একত্ব এবং নৈতিকতার ব্যাপারে কতিপয় সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মায়। এই সহজাত অনুভূতিকে হাদীসের ভাষায় বলা হয় ফিতরাত। আর এই সহজাত প্রবৃত্তির বা ফিতরাতের সাথে বাস্তবতার সামঞ্জস্য মূলতঃ ইসলামী শরী’আতের সৌন্দর্য। এর ঠিক বিপরীতে অবস্থান করে সেক্যুলার সমাজ ব্যবস্থা। পদে পদে মানুষের এই ফিতরাতকে নষ্ট করে দিয়ে নফস ও পশুত্বকে উস্কে দেয়। তারা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক পরিচয় ও ভূমিকাকে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বেঁধে দেয়া চিরন্তন বিধানকে লংঘন করে নিজের প্রবৃতি ও মনের অনুসরণ করা শরয়ী দৃষ্টিতে বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
তুমি কি তাকে দেখেছ যে নিজের কামনা-বাসনাকে উপাস্য মনে করে?
‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে?’ (সুরা ফুরক্বান আয়াত: ৪৩)।
তিনি আরো বলেন, আর তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়’। (সুরা নাবা আয়াত: ৮) আল্লাহ মানুষকে দুইভাবে সৃষ্টি করেছেন। নারী ও পুরুষ। এর বাইরে ট্রান্সজেন্ডার বা সমলিঙ্গের ধারণা বলতে কিছুই নেই। তিনি বলেন,
وما خلق الذكر والأنثى ‘শপথ, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন নর ও মাদী’। (সুরা লায়ল আয়াত: ৩) তিনি আরো বলেন, يهب لمن يشاء إناثا ويهب لمن يشاء الذكور أو يزوجهم ذكرانا وإناثا
‘তিনি যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন ও যাকে চান পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা যাকে চান পুত্র ও কন্যা যমজ সন্তান দান করেন’। (সুরা শূরা আয়াত: ৪৯-৫০)
তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী পুরুষ এবং পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন’। ( বুখারী শরীফ হা. ৫৮৮৫।) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন لَعَنَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ، وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লা’নত করেছেন এমন সব নারীর উপর যারা উল্কি করে, ভ্রূ উপড়িয়ে ফেলে এবং সৌন্দয্যের জন্য দাঁত সরু ও বড় করে আল্লাহর সৃষ্টিকে বদলিয়ে দেয়’। (বুখারী শরীফ হা. ৫৯৪৭; মুসলিম হা. ২১২৪) লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যেখানে সৃষ্টির সামান্য পরিবর্তনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিসম্পাত করছেন, সেখানে একজন পুরুষ বা নারী লিঙ্গ পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টিকে পরিবর্তন করলে তার শান্তি কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
আর ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় সমকামীদের শান্তি হল মৃত্যুদণ্ড। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ، فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ، وَالْمَفْعُولَ بِهِ
‘তোমরা কাউকে যদি লূত গোত্রের মতই কুকর্মে লিপ্ত দেখতে পাও, তাহলে কর্তা ও যার সঙ্গে করা হয়েছে তাদের উভয়কে হত্যা কর’। (-আবু দাউদ শরীফ হা. ৪৪৬২)
এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে সমকামিতা ও পশুকামিতা প্রকৃতিবিরোধী যেনাচার হিসেবে শাস্তিযোগ্য ও দণ্ডনীয় ফৌজদারী অপরাধ।
উল্লেখ্য, একজন পুরুষের লিঙ্গ পরিবর্তন বা ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার অর্থ হল- তার পুরুষাঙ্গ ও অন্ডকোষ কেটে ফেলা, বুকে কৃত্রিম স্তন বসানো। অনুরূপ নারীদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার অর্থ হল- তার শরীর থেকে স্তন, জরায়ু এবং গর্ভধারণের প্রয়োজনীয় অংশসমূহ কেটে ফেলা এবং শরীরে বিভিন্ন অংশ থেকে কিছু মাংসপেশী নিয়ে কৃত্রিমভাবে একটি পুরুষাঙ্গ স্থাপন করা। অথচ আল্লাহ বলেন, لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تقویم ‘অবশ্যই মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে’। (সুরা তীন ৯৫ আয়াত: ৪) তার সৃষ্টির এমন বিকৃতি ঘটানোর অর্থ হ’ল প্রকৃত অর্থে আল্লাহর সঙ্গে বিদ্রোহ করা। আর এটা জঘন্যতম অপরাধ। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি নিজেকে একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর ফিতরাত অনুযায়ী চল, যে ফিতরাতের উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই’। (সুরা রূম আয়াত: ৩০)
তবে কোন পুরুষের যদি মেয়েলি কিছু আলামত থাকে অথচ বাস্তবে সে একজন পুরুষ কিংবা কোন নারীর যদি পুরুষালি কিছু আলামত থাকে অথচ বাস্তবে সে একজন নারী, সেক্ষেত্রে সার্জারী বা ঔষুধ গ্রহণ করে সেই সমস্যার সমাধান করা জায়েয। যেটিকে লিঙ্গ পরিবর্তন নয় বরং লিঙ্গ সংরক্ষণ করা বলা হয়।