الجامعة الإسلامية العبيدية نانوفور

জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর

Jamia Islamia Obaidia Nanupur

প্রশ্নোত্তরে সমসাময়িক প্রয়োজনীয় মাসায়েল

ফেসবুক চালানো প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে ফেসবুকে অশ্লীল বিনোদন চর্চা ও নগ্নতার ছড়াছড়ি। এমতাবস্থায় আমার জানার বিষয় হলো যে, ফেসবুক চালানো জায়েয আছে কিনা? কুরআন-হাদীসের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: ইন্টারনেট জগতে ফেসবুকের আগমন ঘটেছিলো একটি যোগাযোগ মাধ্যমরূপে। কিন্তু বর্তমানে এই ফেসবুক সর্বস্তরের মানুষকে বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের মাদকাসক্তের ন্যায় নেশাগ্রস্থ করে রেখেছে। আর অশ্লীল ভিডিও ও নগ্ন ফটোগ্রাফিতে সময় অপচয় করছে। আর এই ফেসবুকের মাধ্যমে বেগানা নারী-পুরুষেরা পরস্পর পরিচিত হয়ে অবৈধ প্রেম ও পরকিয়ার মত জঘণ্য কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। অডিও-ভিডিও কল ও ফটো আদান-প্রদান করছে। ফেসবুকের এই ভয়াবহ কুপ্রভাবে সমাজ আজ কুলষিত। সাথে সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে বেগানা মহিলাদের ছবি, অশ্লীল বিষয়াবলি প্রদর্শন পর্যবেক্ষণ করা হয়। শরীয়ত পরিপন্থি বিভিন্ন বস্তু প্রচার করা হয়। ফেসবুকের মাধ্যমে এমন সব অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া ও লাইক-কমেন্টের মাধ্যমে এসবকে সমর্থন করা শরীয়ত মতে বৈধ নয়। তবে বৈধ সংবাদ সরবরাহ, দ্বীনি ও কল্যাণকর বস্তু প্রচারের জন্য শরীয়ত পরিপন্থি বিষয়াবলি থেকে বেঁচে থাকার শর্তে ফেসবুক ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।

সুতরাং প্রশ্নোল্লেখিত শরীয়ত পরিপন্থি বিষয়াবলিতে লিপ্ত হয়ে ফেসবুক ব্যবহার করা শরীয়ত মতে জায়েয নেই। তবে যদি কেউ শরীয়ত বিরোধী সকল প্রকার কার্যকলাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে ফেসবুক ব্যবহার করার উপর আস্থাবান হতে পারে, তাহলে তার জন্য ব্যক্তি জীবনের প্রয়োজনে ও দ্বীনের স্বার্থে ফেসবুক ব্যবহার করা জায়েয আছে।

(দেখুন: সূরা আ’রাফ, আয়াত- ১৩২। তাফসীরে তাবারী: খ. ১২ পৃ. ৩৯৫। তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম: খ. ৪ পৃ. ১৬৪। শামী: খ. ৬ পৃ. ৩৬১।)

রেশন কার্ড বন্ধক রাখা প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুদান; মাসিক রেশন কার্ড বন্ধক দিয়ে সেখান থেকে গৃহিত টাকার বিনিময়ে উক্ত অনুদানী খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা যাবে কিনা? অর্থাৎ- ১টি রেশন কার্ড ১,০০০০০/এক লক্ষ টাকা দিয়ে বন্ধক নিয়ে উক্ত কার্ডের প্রাপ্ত (বন্ধক গ্রহিতা) রেশন গ্রহণ করতে পারবে কিনা?

উক্ত পদ্ধতি যদি জায়েয না হয়, তাহলে বন্ধক গ্রহিতার আসল টাকা হতে প্রতি মাসের রেশনের বিনিময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কর্তন করলে জায়েয হবে কিনা?

উত্তর: রেশন কার্ড বস্তুত কোন সম্পদ নয়। এটি মূলত সরকারের পক্ষ থেকে প্রদানযোগ্য সম্পদের সনদ। কার্ডের মালিককে সরকার মাসিক কিংবা বাৎসরিক চাউল, গম, নগদ অর্থ ইত্যাদি প্রণোদনা প্রদান করে থাকে। উক্ত প্রণোদনা গ্রহণ ও হস্তগত করে নেয়ার আগে কার্ডধারী ব্যক্তি ঐ সম্পদের মালিক হয় না। বিধায় তা বন্ধক রাখা বৈধ হবে না। কারণ শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো, যা মাল নয় বা যে মাল এখনো হস্তগত হয়নি তা বিক্রি করা অবৈধ। আর যা বিক্রি করা অবৈধ তা বন্ধক হিসেবে রাখা বৈধ নয়।

হ্যাঁ, তবে রেশন কার্ডধারী ব্যক্তি যদি আপনাকে উকিল বানায় যে, আপনি তার পক্ষ থেকে রেশন তুলে তা ব্যবহার করবেন তাহলে তা জায়েয আছে। বন্ধক হিসাবে নয়। অথবা সে যদি নিজে রেশন তুলে তা আপনার কাছে বিক্রি করে দেয়, তাহলে তা আপনি ক্রয় করতে পারবেন এবং আপনার ঋণকৃত টাকা হতে কর্তনও করতে পারবেন। কিন্তু শর্ত হচ্ছে তার ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।

(দেখুন: সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫। বাইহাকী: খ. ৫ পৃ. ৭৪১ হা. ১১০৩৭। হিদায়া: খ. ৩ পৃ. ৫২২। মাবসুত: খ. ২১ পৃ. ১৪১। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ৮ পৃ. ১৫৯। কাযীখান: খ. ৩ পৃ. ৫৪২। কিফায়াতুল মুফতি: খ. ১১ পৃ. ৫৮২। ফতওয়া মাহমুদিয়া: খ. ২৫ পৃ. ৩৮৭।)

সর্বজনীন পেনশনের টাকা সুদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: সামাজিক সুরক্ষার আওতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা আইন ২০২৩ প্রণয়ন করেছে। এই আইনের আওতায় ১৮ বছর থেকে ৫০ বছরে সরকারি, আধা সরকারী এবং স্বায়ত্তশাসিত ব্যতীত বাংলাদেশের সকল নাগরিক সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সর্বজনীন পেনশন রেজিস্ট্রেশনকারীর বয়সসীমা ৬০ বছর হলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চাঁদার হারের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ পেয়ে থাকবে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকার সর্বজনীন পেনশন এর সমতা স্কিম চালু করেছে। এই স্কিমের আওতায় দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশী নাগরিককে ৫০০ টাকার চাঁদার বিপরীতে সরকার কর্তৃক অতিরিক্ত ৫০০ টাকা পেনশনার এর একাউন্টে যোগ হবে প্রতি এক মাস অন্তর। এবং এখানে মুনাফারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জানার বিষয় হলো:

এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সর্বজনীন পেনশন আইন ২০২৩ ইসলামী শরীয়াহ মতে কতটুকু জায়েয। এই সর্বজনীন ব্যবস্থা ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হিসাবে গণ্য হবে কিনা?

উত্তর: সরকারী কিংবা আধা সরকারী চাকুরীজীবিদের থেকে যে টাকা আবশ্যকীয়ভাবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের নামে কেটে রাখা হয়, তা থেকে যে অতিরিক্ত টাকা মুনাফা হিসাবে প্রদান করা হয়, সেটি ফিক্বহী দৃষ্টিকোণ থেকে চাকুরীজীবির সামগ্রিক চাকুরীর উপর সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক অথবা চাকুরীর উপর বিশেষ অনুদান। এর সাথে শ্রম জড়িত হওয়ায় এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে এর বিপরীতে যে টাকা কর্মচারীগণ স্বেচ্ছায় জমা রাখে, তা থেকে অর্জিত মুনাফা সুদের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্নোল্লিখিত বিষয়, তথা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছেন তা বিশেষত কয়েকটি কারণে শরীয়াহ সম্মত নয়।

ক. উক্ত স্কিমবিধি অধ্যয়নে স্পষ্ট হয় যে, স্কিমে চাঁদাদাতা যে পরিমাণ সঞ্চয় করবে সর্বাবস্থায় সে এর অধিক পাবে। মূল প্রদেয় সঞ্চয় ফেরত পাওয়া যেমন নিশ্চিত, তেমনি এর সাথে অতিরিক্ত মুনাফা পাওয়াও নিশ্চিত। আর পেনশনারগণ জমাকৃত টাকা থেকে যে অতিরিক্ত টাকা পেয়ে থাকবে তা কোন প্রকার ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা কোন প্রকার শ্রমের বিনিময় ছাড়াই সরাসরি টাকার বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করবে। তাই উক্ত টাকা শরয়ী দৃষ্টিতে সুদ হিসেবে গণ্য হবে।

খ. ইসলামী বাণিজ্য আইন অনুসারে কোন লেনদেন অবৈধ হওয়ার অন্যতম কারণ হল তাতে “গারার” অর্থাৎ ধোঁকা বিদ্যমান থাকা। ইসলামী আইন বা ফিহের পরিভাষায় কারবারের মূল চুক্তিতে পণ্য কিংবা মূল্যের বিষয়ে অস্পষ্টতা ও পরিণতির ব্যাপারে অজ্ঞতা সম্বলিত লেনদেনকে “গারার” বলা হয়।

অতএব আলোচিত সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যদিও প্রদেয় সঞ্চয় ফেরত পাওয়া নিশ্চিত। তবে এতে ‘গারার’ আছে। তা এভাবে যে, একজন চাঁদাদাতা এতে অংশগ্রহণের পর সে জানে না তার প্রাপ্তি কী পরিমাণ দাঁড়াবে। পেনশন শুরু হওয়ার পর মারা গেলে এক ধরণের প্রাপ্তি। এর আগে মারা গেলে অন্য ধরণের প্রাপ্তি। উভয় প্রাপ্তি সমান নয়। প্রথম প্রাপ্তি দ্বিতীয় প্রাপ্তির তুলনায় অধিক লাভ জনক।

গ. এ ছাড়াও এতে ‘আল-আকলু বিল বাতিল’ তথা অন্যের সম্পদ অবৈধ ভক্ষণ করা হয়। যেটি নাজায়েয। কুরআন কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

” يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضِ مِنْكُمْ “

অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে যদি পারস্পারিক সন্তুষ্টিক্রমে কোন ব্যবসার মাধ্যমে হয়, (তাহলে জায়েয)। সূরা নিসা আয়াত:২৯

আলোচিত সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিধিমালার ৫/৫ নং ধারায় উল্লেখ আছে যে, কোন চাঁদাদাতা ধারাবাহিকভাবে তিন কিস্তি চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে, তার পেনশন হিসাবটি স্থগিত হয়ে যাবে। পুনরায় চালু করতে হলে নির্ধারিত জরিমানা দিয়ে চালু করতে হবে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, তিন কিস্তি না দেয়ার কারণে তার উপর যে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, এটি শরীয়তে নাজায়েয। উক্ত টাকা গ্রহণ করাটা বিনিময় ছাড়া অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করার নামান্তর।

সুতরাং উপরোক্ত বিশ্লেষণে এ কথা স্পষ্ট যে, প্রশ্নোল্লিখিত সর্বজনীন পেনশন স্কিমটি আদ্যোপান্ত একটি অনৈসলামিক ও শরীয়াহ পরিপন্থি স্কিম। এটি সুদ, গারার ও আল-আকলু বিল বাতিলসহ শরীয়াহ পরিপন্থি নানা সমস্যা সম্বলিত হওয়ায় উক্ত স্কিমে অংশগ্রহণ করা ইসলামী শরীয়ত মতে জায়েয নেই।

(দেখুন: সহীহ মুসলিম: খ. ২ পৃ. ১০৫২ হা. ১৫৯৮। তিরমিযী: খ. ২ পৃ. ৬৪৪ হা. ১৫১৩। তাফসীরে কুরতুবী: খ. ৩ পৃ. ১৩১। আল আসল: খ. ৩ পৃ. ২২। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ৫ পৃ. ১৬৩। শামী: খ. ৫ পৃ. ১৬৬। আলমগীরী: খ. ৩ পৃ. ১২৫। মাহমুদিয়া: খ. ২৪ পৃ. ৪৭৯। কাসেমিয়া: খ. ২০ পৃ. ১৫৮।)

কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে

আমার একটি গাড়ির দোকান আছে। দোকানের পণ্য ও শ্রমিক উভয়টি কোম্পানির। কোম্পানি উক্ত দোকান থেকে গাড়ি সেল করে থাকে। আমি ৫০০০০ টাকা সিকিউরিটি দিয়ে কোম্পানির ডিলারশিপ গ্রহণ করেছি। একটি গাড়ি বিক্রি হলে কোম্পানি আমাকে ১৫০০০/২৫০০০ টাকা প্রদান করে থাকে। কোম্পানি নগদ ও বাকি উভয় পদ্ধতিতে গাড়ি বিক্রি করে থাকে। নগদের তুলনায় বাকিতে গাড়ির মূল্য অনেক বেশি। আমার জানার বিষয় হল, উক্ত ব্যবসা শরয়ী দৃষ্টিতে বৈধ কি না? এভাবে কিস্তির মাধ্যমে গাড়ি বিক্রি করা জায়েয কি না?

উত্তর: শরয়ী দৃষ্টিতে কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় ও নগদের তুলনায় বাকিতে কিছু মূল্য বৃদ্ধি করে ক্রয় বিক্রয় জায়েয আছে। তবে বাকি বিক্রিতে অসহনীয় মূল্য বৃদ্ধি করা অমানবিক হবে। এক্ষেত্রে শর্ত হল, বিক্রয়ের পূর্বে বাকি ও নগদ এ দুয়ের মধ্য থেকে যে কোনো একটি পদ্ধতিতে লেনদেন করার বিষয়ে সুনিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে পণ্যের মূল্য ও তা আদায়ের সময় নির্ধারিত হয়ে যেতে হবে। নির্ধারিত তারিখ থেকে মূল্য আদায়ে বিলম্ব হলে পূর্ব নির্ধারিত দাম থেকে অধিক অর্থ গ্রহণ করা যাবে না।

সুতরাং উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষে প্রশ্নোক্ত পদ্ধতিতে কিস্তিতে গাড়ির ক্রয়-বিক্রয় শরয়ী দৃষ্টিতে জায়েয আছে এবং আপনার শ্রম ও সময়ের মূল্যায়ন হিসেবে কোম্পানি থেকে প্রদানকৃত উক্ত টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে।

(দেখুন: সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২। বুখারী শরীফ: খ. ২ পৃ. ৭৫৯ হা. ২০৬০। হিদায়া: খ. ৩ পৃ. ২১। মাবসুত: খ. ১৩ পৃ. ৮। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ৪ পৃ. ৩৫৮। শামী: খ. ৫ পৃ. ১৪২। আলমগীরী: খ. ৩ পৃ. ৩। ইমদাদুল ফতওয়া: খ. ৬ পৃ. ২৭৯। মাহমুদিয়াহ: খ. ২৪ পৃ. ১৯৩। ফতওয়া উসমানী: খ. ৩ পৃ. ১১৯। আপকে মাসায়িল আওর উনকা হল: খ. ৭ পৃ. ১৭৪।)

বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে গবাদি গাভীর বীর্য ক্রয় বিক্রয় প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: বর্তমানে অনেক মানুষ আয়ের উৎস হিসেবে ফার্মে গরু ছাগল লালন-পালন করে। আর এই সমস্ত গবাদি পশুর প্রজননের জন্য গাভীর জরায়ুতে ইনজেকশনের মাধ্যমে ষাড়ের বীর্য প্রবেশ করানো এবং এর বিনিময় গ্রহণ করার প্রচলন রয়েছে। গ্রাম অঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ এর সাথে যুক্ত। কিন্তু ইদানিং কিছু মানুষের দাবি হলো গবাদি পশু প্রজননের উক্ত পদ্ধতি বৈধ নয়।

অতএব মুফতী সাহেবগণের নিকট জানার বিষয় হলো, ফার্মের গরু ছাগলের প্রজননের বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতি শরীয়ত সম্মত কিনা? বিস্তারিত দলীল প্রমাণসহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তর: ইনজেশনের মাধ্যমে গরু ছাগলের প্রজননের বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল না। সে সময় সরাসরি ষাড়ের মাধ্যমে গাভীকে পাল দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা হতো। বর্তমানেও কিছু কিছু গ্রামাঞ্চলে এ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এভাবে পাল দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে।

এ পদ্ধতিতে পাল দিয়ে বিনিময় গ্রহণ না জায়েয হওয়ার দুটি কারণ:

এক. গবাদি পশুর জরায়ুতে যে বীর্য প্রবেশ করানো হয় তা বিক্রয় যোগ্য সম্পদ না হওয়া। কেননা উক্ত বীর্য মূল্যহীন ও নাপাক বস্তু। আর মূল্যহীন নাপাক বস্তু শরয়ী দৃষ্টিতে সম্পদ নয়। ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হওয়ার জন্য পণ্যটি সম্পদ হওয়া আবশ্যক।

দুই. বিক্রিত পণ্যের পরিমাণ নির্ধারণে অজ্ঞতা ও তা হস্তান্তরের মধ্যে অনিশ্চয়তা। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি হলো বিক্রিত বস্তুর পরিমাণ, অবস্থা সুনির্ধারিত হতে হবে। সাথে সাথে তা হস্তান্তরের যোগ্য হতে হবে। কিন্তু বীর্য হস্তান্তরের যোগ্য সম্পদ নয়। অন্য দিকে তা গাভীর জরায়ুতে কি পরিমাণ প্রবেশ করেছে কিংবা আদৌ প্রবেশ করেছে কি না তা নিশ্চিত নয়। এ জন্য এর বিনিময় গ্রহণ শরয়ী দৃষ্টিতে জায়েয নয়।

তবে গবাদি পশুর প্রজননের জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে গাভীর জরায়ুতে বীর্য দেয়ার যে পদ্ধতি বর্তমান সমাজে বহুল প্রচলিত তাতে উল্লিখিত কারণগুলো পাওয়া যায় না। কেননা বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গবাদি পশুর বীর্যকে বিভিন্ন ক্যামিকেল দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করে থাকে। সাথে সাথে এর প্রতি মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তা পশু লালন-পালনকারীদের আগ্রহের বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। এসব কারণে শরয়ী মূলনীতির আলোকে উক্ত প্রক্রিয়াজাতকৃত বীর্য বিক্রয়যোগ্য সম্পদ হিসাবে গণ্য। আর ইনজেকশনের মাধ্যমে গাভীর জরায়ুতে বীর্য প্রবেশের বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত, তাই তাতে ধোঁকা ও অজ্ঞতার সুযোগ থাকে না।

সুতরাং প্রশ্নোক্ত অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে ফার্মের গরু ছাগল প্রজননের বর্তমানে যে পদ্ধতি প্রচলিত আছে তা সম্পূর্ণ বৈধ।

(দেখুন: সুরা নাহাল, আয়াত: ৫। বুখারী শরীফ: খ. ২ পৃ. ২৯৭ হা. ২১৬৪। মাবসুত: খ. ২৪ পৃ. ১৫। হিদায়া: খ. ৪ পৃ. ৩৭৫। তাবয়ীনুল হাকায়েক: খ. ৫ পৃ. ১২৪। বাদইয়ুস সানায়ে: খ. ৫ পৃ. ১৪৪। আলমুহিতুল বুরহানী: খ. ৬ পৃ. ৩৫০। আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: খ. ৪ পৃ. ২৬৪৯। দারুল উলুম দেওবন্দ ওয়েবসাইট, ফতওয়া নং: ১৭৩৮৭৫। কিতাবুন নাওয়াযেল: খ. ১২ পৃ. ৪৭৪।

জন্মদিন প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: বর্তমানে দেখা যায় যে, মানুষেরা একে অপরকে সামনাসামনি বা ফেসবুকের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে জন্মদিবস পালন করে। এখন আমার জানার বিষয় হলো অনুষ্ঠান ইত্যাদি না করে শুধু একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে জন্মদিবস পালন করা জায়েয হবে কিনা? দলীল-প্রমাণসহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তর: ইসলামী শরীয়তে জন্ম দিবস পালন করা প্রমাণিত নয়। সুতরাং তা নতুন আবিষ্কৃত ও ইসলামের ভিতর নতুন সংযোজন। কেননা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম রাযি., তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীনদের যামানায় ছিল না। এবং এতে রয়েছে,

১. টাকা-পয়সার অপচয়।

২. বিধর্মীদের প্রথার অনুসরণ।

আর তাদের যেকোন প্রথা আমাদের জন্য গ্রহণ করা জায়েয নেই। তাই শুধু শুভেচ্ছা জানিয়ে জন্মদিবস পালন করাও জায়েয নেই। কারণ এটিও তাদের প্রথাসমূহ থেকে একটি প্রথা। আর মুসলমানদের জন্য তাদের সমস্ত প্রথা পরিত্যাগ করা আবশ্যক।

(দেখুন: আল-কোরআনুল কারীম, সূরা হুদ, আয়াত- ১১৩। সুনানে আবি দাউদ: খ. ২ পৃ. ৪৪১। মিউশাতুল মাসাবিহ: খ. ১৩ পৃ. ৯৬। তাফসিরে তাবারী: খ. ১১ পৃ. ১৩২। কেফায়াতুল মুফতি: খ. ৯ পৃ. ৮৪।)

সরকারীর খাস জমিতে মাদরাসা-মসজিদ করা প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: আমার জানার বিষয় হলো সারি (নদী ভরাট) খাসের জায়গায় সরকার অনুমোদিত ডিসিআর ব্যতীত মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে কি-না? এবং উক্ত মাদরাসায় দান করা ও ওয়াক্বফকৃত মাদরাসায় দান করার ছওয়াবের ভিতরে ব্যবধান আছে কি-না? এবং উক্ত মসজিদে নামায পড়লে ছওয়াবের ভিতরে কোন ধরণের কমতি হবে কি-না?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের জন্য সমস্ত জমীনকে সেজদার স্থান বলে ঘোষণা করেছেন। প্রত্যেক পবিত্র ও উপযুক্ত স্থানে জায়গার মালিকের সম্মতি থাকলে নামায আদায় করা জায়েয আছে।

সুতরাং সরকারী খাস জমিতে সরকার কর্তৃক অনুমতি থাকলে এবং কোন ধরণের বাঁধা না থাকলে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করা জায়েয। উক্ত মসজিদে নামায আদায় করার দ্বারা নামাযের পূর্ণ সাওয়াব পাওয়া যাবে। তবে ওয়াক্বফিয়াহ-শরয়ী মসজিদে নামায আদায় করলে যে সাওয়াব পাওয়া যায়, সে সাওয়াব পাওয়া যাবে না। এমতাবস্থায় মসজিদ কমিটি ও এলাকাবাসী যেকোনো উপায়ে উক্ত জায়গা সরকারের কাছ থেকে মসজিদের নামে করে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।

আর একজন মুসলমান শাসকের জন্যে উচিত হল, এধরণের জায়গা মুসলমানদের কল্যাণ ও ইবাদত-বন্দেগী করার সুবিধার্থে মসজিদ বা মাদরাসার নামে রেজিস্ট্রি দিয়ে দেয়া।

আর উক্ত মাদরাসার দ্বীনী শিক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা থাকলে তাতে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানকারীগণ মাদরাসায় দান-সদকাহ করার পূর্ণ সাওয়াব পাবে।

(দেখুন: সুরা তাওবা, আয়াত: ১৮। তাফসীরে আহকামুল কুরআন: খ. ৭ পৃ. ৪৪৫। তিরমিযী: খ. ১ পৃ. ২৩৬ হা. ২৩৮। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ৭ পৃ. ১৫৯। মুহিতে বুরহানী: খ. ৬ পৃ. ২০৭। শামী: খ. ৪ পৃ. ৩৪০। তাবয়ীনুল হাকায়েক: খ. ১০ পৃ. ২২৩। আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: খ. ৬ পৃ. ৪৬০৭। ইমদাদুল মুফতীন: পৃ. ৬৬৪ ও ৮১২। আহসানুল ফতওয়া: খ. ৬ পৃ. ৪৫২। মাহমুদিয়া: খ. ১৫ পৃ. ১৭৮। নেজামুল ফতওয়া: খ. ২ পৃ. ৩১১। কাসেমিয়া: খ. ১৮ পৃ. ৩৩৭।

উশর ও খারাজ প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: উশর ও খারাজের বিষয়টি নিয়ে এ দেশের মানুষ খুবই বিভ্রান্তে লিপ্ত। তাই এ সম্পর্কে নিম্নে কয়েকটি প্রশ্নের শরয়ী সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

ক. উশর ও খারাজ কাকে বলে? এর শরয়ী পরিচয় কী?

খ. উশর ও খারাজের হুকুম কী?

গ. উশর ও খারাজের শর্তাবলি কি কি?

ঘ. উশর কখন আবশ্যক হয়? আর নিসফ উশর কখন আবশ্যক হয়?

ঙ. ফসল উৎপাদন করতে কৃষকের যে খরচ ও শ্রম দিতে হয়, এগুলো বাদ দিয়ে উশর ওয়াজিব হবে? নাকি পুরো উৎপাদনের উপর উশর ওয়াজিব হবে?

চ. উশর ও খারাজের ব্যয়ের খাত কি?

ছ. উশরি জমি থেকে সরকার যদি ট্যাক্স নেয়, তাহলে কি উশর রহিত হয়ে যাবে? নাকি সরকার ট্যাক্স নিলেও উশর আদায় করতে হবে?

জ. বাংলাদেশের জমি উশরী না খারাজী? এ দেশের মানুষ এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে লিপ্ত। তারা জানে না যে, তাদের জমি উশরী না খারাজী?

উত্তর: সোনা-রূপা, নগদ টাকা-পয়সা, ব্যবসায়িক পণ্যে যেভাবে যাকাত ফরয হয়। ঠিক তদ্রুপ জমির উৎপন্ন শস্যর উপর উশর এবং খারাজ ফরয হয়। নিম্নে উল্লিখিত প্রশ্নের ধারাবাহিক উত্তর প্রদান করা হলো:

ক. উশরের আভিধানিক অর্থ: হচ্ছে। এক দশমাংশ।

উশরের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, জমির যাকাত হিসেবে মুসলমানদের থেকে যা নেওয়া হয়। খারাজের আভিধানিক অর্থ: হচ্ছে, ভূমিকর, জমি থেকে যা কিছু উৎপন্ন হয়।

খারাজের পারিভাষিক অর্থ: হচ্ছে, যুদ্ধ করে বিজিত ভূমির উপর কিংবা যে ভূমির অধিবাসীরা মুসলিম শাসকের সঙ্গে খারাজ দেয়ার সন্ধি করে নিজ ভূমিতে বহাল থাকে, সেসব জমির উপর রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত কর।

খ. উশরি জমির উশর আদায় করা ফরয। তা কোন সময় দশভাগের একভাগ হয়। আবার কোন সময় বিশভাগের একভাগ হয়। খারাজি জমির খারাজ আদায় করা উশর আদায়ের মত ইবাদত নয়, কিন্তু জমির উপর শরীয়তের একটি হক যা আদায় করা ওয়াজিব।

গ. উশরি ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলি:

(১) মুসলমান হওয়া; কারণ উশর এক ধরণের ইবাদত। আর কাফের ইবাদতেরযোগ্য নয়।

(২) জমি উশরি হওয়া; কারণ খারাজী জমির উপর উশর ওয়াজিব হয় না।

(৩) ফসল উৎপাদন হওয়া; সুতরাং কোনো কারণে ফসল উৎপাদন না হলে উশর ওয়াজিব হবে না।

(৪) উৎপাদিত সম্পদ এমন হওয়া যা জমির ফসল হিসেবে চাষ করা হয়; সুতরাং জমিতে যেসব আগাছা, খড়, ঘাস, ইত্যাদি হয় এতে উশর ওয়াজিব হয় না। হ্যাঁ, যদি ঘাস, বাঁশ, এগুলো আয়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন করা হয়, তাহলে এগুলোর উশর দেয়া ওয়াজিব হবে।

ঘ. ভূমি যদি বৃষ্টির পানি, প্রবাহিত ঝর্ণা বা নদীর পানি, ইত্যাদির দ্বারা সেচকৃত হয় এবং সেচ কাজের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরিশ্রম ছাড়া অতিরিক্ত পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে না হয়, তাহলে উৎপন্ন শস্যের দশভাগের একভাগ ওয়াজিব হবে। অন্যথায় বিশভাগের একভাগ ওয়াজিব হবে।

ঙ. সম্পূর্ণ উৎপাদনের উপর উশর (দশভাগের একভাগ) বা নিসফে উশর (বিশভাগের একভাগ) ওয়াজিব হবে। খরচ থেকে উৎপাদিত ফসল কম হোক কিংবা বেশি হোক। নির্ধারিত ওয়াজিব থেকে খরচ কর্তন হবে না।

চ. উশর আদায় করা ওয়াজিব। আর সকল ওয়াজিব সাদাকার ব্যয়ের খাত এক ও অভিন্ন। তাই যাদেরকে যাকাত আদায় করা হয়, তাদেরকেই উশর আদায় করতে হবে। যে খাতে যাকাত ব্যয় হয়, সে খাতেই উশর ব্যয় করতে হবে। খারাজ ব্যয়ের খাত হচ্ছে সাধারণ জনগণের কল্যাণমূলক কাজ। যেমন রাস্তাঘাট ও পুল নির্মাণ করা, মুসলিম দেশের সীমান্ত পাহারা, সামরিক কাজকর্ম, ওলামায়েকেরামের ভাতা ইত্যাদি।

ছ. উশরী জমি থেকে সরকার ট্যাক্স নেয়ার দ্বারা উশর আদায় বা রহিত হবে না। বরং উশর আলাদাভাবে আদায় করতে হবে।

জ. বাংলাদেশি জমির বিধান:

(১) যেসব জমি বর্তমানে মুসলমানদের মালিকানাধীন রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের মালিকানায় ছিল। মাঝে কোনো অমুসলিমের হস্তগত হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা না যায়। এসব জমি উশরি হিসেবে গণ্য হবে।

(২) কোনো অনাবাদি জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে আবাদ করার পর তা মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করা হলে সেগুলো উশরি হিসেবে ধর্তব্য হবে।

(৩) রাষ্ট্রের অনুমতি সাপেক্ষে কোনো মুসলমান অনাবাদি জমি আবাদ করলে তা যদি খারাজি জমির পাশ্ববর্তী হয় তাহলে খারাজি অন্যথায় উশরি হিসেবে গণ্য হবে।

(৪) অমুসলিমদের মালিকানাধীন সকল প্রকার জমি খারাজি।

(৫) যেসব জমি অমুসলিমদের মালিকানায় এসেছে সেগুলো খারাজি।

সুতরাং বাংলাদেশের যে সমস্ত জমি বর্তমানে মুসলমানদের হাতে রয়েছে এবং কোনো মুসলমানের মালিকানা থেকে তাদের নিকট উত্তরাধিকার বা ক্রয়সূত্রে এসেছে তা উশরি জমি হিসেবে গণ্য হবে। আর এদেশের যে সমস্ত জমি অমুসলিমদের কর্তৃত্বে রয়েছে বা তাদের কাছ থেকে কোনো মুসলমানের মালিকানায় এসেছে তা খারাজি জমি হিসেবে গণ্য হবে। এবং প্রত্যেক বৎসর একবার খারাজ বা ট্যাক্স আদায় করতে হবে। আমাদের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে যে খাজনা নেয়া হয়, তাতে দাতা যদি খারাজ আদায়ের নিয়্যত করে, তাহলে খাজনা দ্বারাই খারাজ বা ট্যাক্স আদায় হয়ে যাবে। তবে উশরি জমির উশর আলাদা ভাবে গরীব-মিসকীনদের মাঝে বন্টন করতে হবে।

আর যদি উল্লিখিত জমিন কোন প্রকারের তা জানা না যায় বা সন্দেহ হয়, সেক্ষেত্রে সতর্কতা হিসেবে উশর আদায় করা শ্রেয়।

(দেখুন: সুরা আনআম, আয়াত: ১৪। বুখারী শরীফ: খ. ২ পৃ. ৫৪০ হা. ১৪১২। আহকামুর কুরআন: খ. ৩ পৃ. ১৫। আল আসল: খ. ২ পৃ. ১২৯। জামিউস সগীর: পৃ. ১৩১। কিতাবুল খেরাজ: পৃ. ১০৩। কিতাবুস সিয়ার ওয়াল খেরাজ ওয়াল উশর: পৃ. ২৫৯। হিদায়া: খ. ২ পৃ. ৫৯০। মাবসুত: খ. ৩ পৃ. ৪। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ২ পৃ. ৫২৬। কাযীখান: খ. ১ পৃ. ২৩৭। শামী: খ. ৩ পৃ. ৩৩৩। ফতওয়া রশিদিয়‍্যাহ: পৃ. ৪৪৭। ফতওয়া উসমানী: খ. ২ পৃ. ১২৭।

ওয়াক্বফ না করে নিজ জায়গায় মাদরাসা করা প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: আমার নিজের নামে রেজিস্ট্রিকৃত জায়গায় ওয়াক্বফ না করে, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে মাদরাসা পরিচালনা করতে পারবো কিনা? কোরআন-হাদীসের আলোকে জানালে খুশি হব।

উত্তর: মালিকানা জায়গাতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা জায়েয আছে। তবে মাদরাসার স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তার জন্য জমি ওয়াক্বফকৃত হওয়া উত্তম। সুতরাং প্রশ্নোল্লিখিত অবস্থায় আপনি নিজের নামে রেজিস্ট্রিকৃত জমিতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে উক্ত মাদরাসা পরিচালনা করতে পারবেন। এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে ওয়াক্বফহীন কিংবা ওয়াকুফিয়া মাদরাসায় সর্বাবস্থায় দ্বীনের দাওয়াত ও দ্বীনের খেদমতের নিয়ত রাখার পাশাপাশি উক্ত দ্বীনি কাজ আমানতদারী ও দিয়ানতদারীর সাথে সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়া জরুরি। (দেখুন: সুনানে আবি দাউদ: খ. ৩ পৃ. ২৪। বায়হাকী: খ. ৯ পৃ. ২৩১। হেদায়া: খ. ৩ পৃ. ২১। বাহরুর রায়েক: খ. ৫ পৃ. ২৭৪। লুবাব: খ. ২ পৃ. ১৮৭।)

নামাযে মাসনূন ক্বিরাত প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: বর্তমানে ইমাম সাহেবগণকে দেখা যায় যে, নামাযে সুন্নাত ক্বিরাতের প্রতি লক্ষ্য না রেখে, যখন যেখান থেকে ইচ্ছা তিলাওয়াত করে থাকেন। জানার বিষয় হলো:

ক. নামাযে জ্বিরাতের সুন্নাত তরীকা কি.?

খ. “তিওয়ালে মুফাসসাল” “আওসাতে মুফাসসাল” ও কিসারে মুফাসসাল” ব্যতীত কুরআনুল কারীমের অন্য কোনো স্থান থেকে ঐ পরিমাণ সূরা বা আয়াত পড়ার দ্বারা ক্বিরাতের সুন্নাত আদায় হবে কি না?

উত্তর: শরীয়তের গ্রহণযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, ফজর ও যোহর নামাযে “তিওয়ালে মুফাসসাল” তথা “সূরা হুজুরাত” থেকে “সূরা বুরূজ” পর্যন্ত, আসর এবং ইশায় “আওসাতে মুফাসসাল” তথা “সূরা ত্বরিক” হতে “সূরা বায়ি‍্যনাহ” পর্যন্ত, এবং মাগরিবের নামাযে “কিসারে মুফাসসাল” তথা “সূরা যিলযাল” হতে শেষ পর্যন্ত যেকোনো একটি স্থান থেকে পাঠ করা সর্বসম্মতিক্রমে সুন্নাত। তবে উক্ত স্থান থেকে কতুটুকু পড়তে হবে এর পরিমাণ ফুকাহায়ে কিরামগণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তথা ফজর ও যোহর নামাযে ৪০ থেকে ৬০ আয়াত কিংবা ১০০ আয়াত পর্যন্ত। আছর এবং ইশায় ১৫ হতে ২৫ আয়াত ও মাগরিবের নামাযে প্রত্যেক রাকাতে ৫ আয়াত সমপরিমাণ পড়ার দ্বারা ক্বিরাতের সুন্নাত আদায় হবে। এক্ষেত্রে ইমামের জন্য মুকতাদিদের অবস্থা ও সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে ক্বিরাত কম বেশি করার সুযোগ আছে।

তবে বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তিওয়াল, আওসাত ও কিসার থেকে পড়া এবং নির্ধারিত পরিমাণে পড়া পৃথক পৃথক সুন্নাত।

খ. পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্য যে সকল সূরা বা আয়াত নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থাৎ “তিওয়াল, আওসাত ও কিসার” ব্যতীত কুরআন কারীমের অন্য কোথাও থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে পড়ার দ্বারা উক্ত সুন্নাত আদায় হবে না। তবে মাঝে মধ্যে কুরআন কারীমের অন্য স্থান থেকে সুন্নাত ক্বিরাত সমপরিমাণ পড়াও সুন্নাত পরিপন্থি নয়।

এসব হুকুম সাধারণ অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সফর কিংবা অপারগতার সময়, অবস্থা ও সক্ষমতানুযায়ী সহজ সাধ্য ক্বিরাত পাঠ করলে সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।

(দেখুন: সুরা মুযযাম্মিল, আয়াত: ২০। সহীহ মুসলিম: খ. ১ পৃ. ৩৮১ হা. ১০১৬। ইলাউস সুনান: খ. ৪ পৃ. ৩৫ হা. ১০১০। জামিউস সগীর: পৃ. ৯৫। হিদায়া: খ. ১ পৃ. ১১৯। খুলাসাতুল ফতওয়া: খ. ১ পৃ. ৯৩। তাবয়ীনুল হাকায়েক: খ. ১ পৃ. ৩৩২। মাজমাউল আনহুর: খ. ১ পৃ. ১৫৮-১৫৯। শামী: খ. ২ পৃ. ২৬১। আলমগীরী: খ. ১ পৃ. ৮৫। আহসানুল ফতওয়া: খ. ৩ পৃ. ৭২। কিফায়াতুল মুফতি: খ. ৪ পৃ. ৪৮২। মাহমুদিয়া: খ. ১০ পৃ. ৪৭৫।

প্রাইভেট মাদরাসায় জুমার নামায আদায় প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: আমি একটা ভাড়া ফ্লাটে প্রাইভেট মাদরাসা করেছি। মাদরাসা থেকে জুমার মসজিদ অনেক দূর। গাড়ির রাস্তা পার হয়ে যেতে হয়, যা ছাত্রদের নিরাপত্তায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে। যার কারণে মাদরাসায় জুমার নামায পড়তে হয়। এখন আমার জানার বিষয় হল, আমাদের জন্য মাদরাসায় জুমার নামায আদায় করা সহীহ কি না?

উত্তর: জুমার নামায সহীহ হওয়ার জন্য মসজিদ হওয়া শর্ত নয়। বরং জুমা আদায়ের শর্তগুলো পাওয়া গেলে যে কোন স্থানে জুমা আদায় করতে পারবে। তবে শরয়ী জামে মসজিদে গিয়ে আদায় করলে যে সওয়াব সে সাওয়াব পাওয়া যাবে না।

সুতরাং দূরত্বের কারণে মসজিদে আসা যাওয়া অসুবিধা হলে কিংবা ছাত্রদের নিরাপত্তায় বিঘ্নতা ঘটলে, মাদরাসায় সর্বসাধারণের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার শর্ত সাপেক্ষে, ভাড়া ফ্লাটে প্রাইভেট মাদরাসায় জুমা আদায় করলে জুমা সহীহ হয়ে যাবে। তবে শরয়ী জামে মসজিদে গিয়ে আদায় করার সাওয়াব পাওয়া যাবে না।

(দেখুন: আল মুহীতুল বুরহানী: খ. ২ পৃ. ৬৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া। বাদাইয়ুস সানায়ে: খ. ২ পৃ. ১৮৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া। আল বাহরুর রায়েক: খ. ৪ পৃ. ৩১৯ দারু ইহয়াইত তুরসি আরবী। ফতুয়ায়ে শামী: খ. ৩ পৃ. ১৫/১৬। ফতুয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ: খ. ৫ পৃ. ৭৩।)

ফজরের সুন্নত আদায় করা প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: একজন ব্যক্তি ফজরের জামাত চলাকালীন মসজিদে উপস্থিত হলে উক্ত ব্যক্তি ফজরের সুন্নাত কখন আদায় করবে? জামাতে অংশ গ্রহণের পূর্বে আদায় করবে? নাকি ফজরের নামায আদায় করার পর আদায় করবে? যথাযথ শরয়ী সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: শরীয়তের গ্রহণযোগ্য কিতাবাদী অধ্যয়নে প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি সুন্নাত আদায় করে ইমামের সাথে বৈঠকে শরীক হওয়ার প্রবল ধারণা হলে নামাযের কাতার থেকে দুরবর্তী স্থানে সুন্নাত আদায় করে নিবে। এরপর ইমামের সাথে নামাযে শরীক হবে। আর যদি সুন্নাত আদায় করে ইমামের সাথে শেষ বৈঠকে শরীক হওয়ার বিষয়টি সুনিশ্চিত না হয়, তাহলে সুন্নাত আদায় করা ছাড়াই ইমামের সাথে জামাতে অংশগ্রহণ করবে।

উল্লেখ্য যে, ফজরের নামায আদায়ের পর থেকে সূর্য উদয়ের পূর্ব মূহূর্ত পর্যন্ত সুন্নত, নফলসহ যে কোন ধরনের নামায আদায় করা মাকরূহ।

(দেখুন: কোরআনুল কারীম, সূরা বাকারা, আয়াত- ২৩৮। সহীহ বোখারী শরীফ হাদিস: (৫৮৪)। মুসলিম শরীফ হাদিস: (৮২৫)। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: খ. ২ পৃ. ১৫৩। জামিউস্ সগীর: পৃ. ৯০-৯১। মুখতাসারূল কুদূরী: পৃ. ৩১। হেদায়া: খ. ১ পৃ. ১৫২। ফাতহুল কাদীর: খ. ১ পৃ. ৪৯২। শামী: খ. ২ পৃ. ৫১০।)

হিন্দু বাড়িতে খাবার খাওয়া প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: আমি একজন কাঠ মিস্ত্রি, মানুষের বাড়িতে মিস্ত্রির কাজ করি, কখনো কখনো হিন্দু বাড়িতেও কাজ করতে হয়। কাজ দীর্ঘ হওয়ার কারণে অনেক দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতে হয়। তখন হিন্দু বাড়িতেই খেতে হয়। এখন আমার জানার বিষয় হলো, এমতাবস্থায় কি আমার জন্য হিন্দু বাড়িতে খাওয়া বৈধ হবে?

উত্তর: হিন্দু কিংবা অন্য ভিন্ন ধর্মীদের রান্না করা খাবার নিম্নে লিখিত শর্ত সাপেক্ষে জায়েয আছে, যথা.

১. উক্ত খাদ্য হারাম না হতে হবে।

২. তাতে হারাম কোন সংমিশ্রন না হতে হবে।

৩. প্রাণীর গোল্ডের ক্ষেত্রে তাদের জবাইকৃত না হতে হবে।

৪. খাবারগুলো প্রসাদ বা তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্য সামগ্রী না হতে হবে।

৫. এবং উপার্জন বৈধ হতে হবে।

সুতরাং প্রশ্নোল্লিখিত শর্তসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনে তাদের বাড়িতে খানা খাওয়া জায়েয আছে।

(দেখুন: সুরা আনফাল, আয়াত: ১২১, ও হেদায়া খ.৩ পৃ.১৩৫, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া খ.১৮ পৃ.১৬৬, ফাতাওয়ায়ে হিন্দীয়া খ.৫ পৃ.৩৪৭, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া খ.২৭ পৃ.৬৪, কেফায়াতুল মুফতী খ.১২ পৃ.১৬৭, আহসানুল ফাতাওয়া খ.৮ পৃ.১২৪)।

Scroll to Top