যুগে যুগে যে সব মহামনীষীগণ জামিয়ার পরিচালক
ও শায়খুল হাদীস পদে সমাসীন ছিলেন
বিগত অর্ধ শতাব্দী পূর্বে ধুলায় মিশ্রিত মক্তবটি তিলে তিলে গড়ে ওঠা ইটের পর ইটের গাঁথুনী দিয়ে শত কষ্ট, বহু বাধা, অনেক ঝড় তুফান উপেক্ষা করে, অনেক মহৎ ব্যক্তিবর্গের নিরলস পরিশ্রমে, রক্ত আর ঘামের বিনিময়ে বেড়ে ওঠা আজকের এই সু-বিশাল জামিয়া। যার সুনাম আর সুখ্যাতি বাংলার সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। যার শুরু বা অতীত ইতিহাস বড়ই করুণ। কে বলবে এ সু-বিশাল জামিয়া, যার আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা, সে কিনা এক দিন ধুলা বালিতে গড়া- গড়ি খেয়েছিল।
সে তো এখন বাংলা তথা বিশ্বের বুকে বিশেষ অবস্থানে নিজের আসনকে মজবুত করে নিয়েছে। বিশ্বে যত বড় বড় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তার মাঝে এটিও অন্যতম একটি। তবে এ পর্যায়ে আসতে প্রতিষ্ঠাতা হতে শুরু করে বর্তমান পরিচালক পর্যন্ত কারোরই অবদান কম নয়। সে অনেক কথা যা স্বল্প পরিসরে লিখার মত নয়। তাই ভূমিকা রেখেই শিরোনামে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হলো।
জামিয়ার প্রথম পরিচালক
জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়ার যিনি প্রথম পরিচালক ছিলেন, তিনি হলেন হযরতুলহাজ্ব আল্লামা আমির উদ্দীন সাহের (রহ.)। তিনি এলাকার ধর্মপ্রাণ মাস্টার ফজলুর রহমান সাহেবের এবাদতখানায় ১৩৭৭ হি. শাওয়ালের ২৯ তারিখে পড়ানো আরম্ভ করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে উন্নীত হয়ে বর্তমান জামিয়া ইসলমিয়া ওবাইদিয়া হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তিনি ১৩৮০ হিজরী পর্যন্ত পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে উস্তাদ ছিলেন হযরত আলহাজ্ব ক্বারী আফছার আহমদ (রহ.) এবং ভূজপুর নিবাসি ক্বারী হামেদ সাহেব, মরহুম মাও. মাহমুদুল অলি সাহেব (রহ.) এবং হযরত মরহুম আবু সুফিয়ান (রহ.) প্রমুখ।
জামিয়া ওবাইদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হযরত মাও. আমির উদ্দীন (রহ.)। ১৯২২ ইং মাইজভান্ডার গ্রামের জনাব অছি মিঞা পন্ডিতের ঔরসে জন্ম নেন। তিনি প্রথম থেকে জামাতে পাঞ্জুম পর্যন্ত নানুপুর বাজারে অবস্থিত হযরত মরহুম মাও. ওবাইদুল হক সাহেব রহ. প্রতিষ্ঠিত হেমায়াতুল ইসলাম মাদ্রাসায় হুজুরের নিকট পড়েন। সেখান থেকে চট্টগ্রাম দারুল উলূম আলিয়া মাদ্রাসায় দুই বছর লেখা- পড়া করেন। তারপর ভারতের প্রসিদ্ধ দারুল উলূম দেওবন্দে লেখাপড়া করেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে এলে, তাঁর উস্তাদের প্রতিষ্ঠিত হেমায়াতুল ইসলামে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। তারপর মাদ্রাসাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন বাবুনগর মাদরাসায় পড়ান। তারপর কিছুদিন চাড়ালিয়াহাট মাও. মরহুম আব্দুল্লাহ সাহেবের মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। অতঃপর জামিয়া ওবাইদিয়া প্রতিষ্ঠা করার পর এই জামিয়াতে সারা জীবন কাটিয়ে দেন।
তিনি পাকিস্তানের মুফতীয়ে আজম মাও. মুফতী শফি সাহেব রহ. এর খলিফা ছিলেন। ১৩৮০ হি. হজ্বে যাওয়ার সময় অলিয়ে কুল পটিয়ার মুফতী আজিজুল হক সাহেব রহ.-এর পরামর্শে হযরত মাও. শাহ সোলতান আহমদ নানুপুরী রহ. কে মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব দেন। ২৫ মে ১৯৮৪ ইং ২২শাবান ১৪০৪ হিজরী ৬৩ বৎসর বয়সে তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।
জামিয়ার দ্বিতীয় পরিচালক
জামিয়ার দ্বিতীয় মুহতামিম হলেন হযরত আল্লামা শাহ্ সোলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)। তিনি ১৩৭৯ হিজরীতে উপদেষ্টা পরিচালক ছিলেন। ১৩৮০ হিজরীতে মাদ্রাসা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। প্রায় ২৭ বছর এই জামিয়ায় মহা পরিচালক ছিলেন। যার ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির বদৌলতে আজ এই মাদ্রাসা, বিশ্ববিখ্যাত জামিয়া হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। হযরত নানুপুরী হুজুর রহ. ১৩৩২ হিজরীর শাবান মাসের দুই তারিখে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়িস্থ ধর্মপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আড়াই বছর বয়সে তাঁর মায়ের ইন্তেকাল হয়। তিনি আরবী শশুম জামাতে পড়াকালীন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। তিনি এশিয়ার অন্যতম বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে পড়াশুনা শেষ করেন। অসাধারণ প্রতিভা এবং সৌহার্দপূর্ণ মনোভাব ও চারিত্রিক মাধুর্যতায় সুপ্রসিদ্ধ হওয়ায় তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মসজিদের ইমামতির মত গুরু দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই ছিলেন হাদীস তাফসীর ও ফিক্বাহ, এক কথায় উলূমে দিনের এক অদ্বিতীয় ধারক এবং একজন বিচক্ষণ ও আদর্শ শিক্ষক। উল্লেখ্য, তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনে মুসলিম শরীফ ও বুখারী শরীফসহ হাদীস এবং ফিক্বাহ্, বালাগাত ও মানতেক ইত্যাদী বিষয়ের কিতাবাদী পাঠদানে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন। অবশেষে তিনি বিগত ১৯৯৭ ঈ. মোতাবেক ১৪১৮ হি. ইহকাল ত্যাগ করে মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দেন।
জামিয়ার তৃতীয় পরিচালক
জামিয়ার তৃতীয় পরিচালক হলেন কুতুবে আলম হযরত আল্লামা শাহ্ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)। নানুপুরী হযরত ইন্তেকালের ১৩ বছর পূর্বে কুতুবে আলম খতীবে ইসলাম শাহ্ জমীর উদ্দীন নানুপুরী (রহ.) কে পরিচালক হিসাবে মনোনীত করেন এবং নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুদীর্ঘ প্রায় ২৭ বৎসর তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালন করেন। নানুপুরী হযরতের পরিপূর্ণ তাওয়াজ্জুহ এবং শাহ জমীর উদ্দীন (রহ.) এর ত্যাগ আর আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির বদৌলতে আজ জামিয়া ওবাইদিয়া আগের চেয়ে বহুগুণে উন্নীত হয়েছে। কুতুবুল আলম আল্লামা শাহ্ জমীর উদ্দীন নানুপুরী রহ. চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ফটিকছড়ির প্রসিদ্ধ নানুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৬ সনের এক শুভ মুহুর্তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আঃ গফুর সাহেব রহ.। দাদার নাম মরহুম নিয়ামত আলী ও পর দাদার নাম মরহুম হিম্মত আলী। বংশীয় দিক থেকে তিনি অত্যন্ত গৌরবের অধিকারী। তিনি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে পড়ালেখার পর এশিয়ার অন্যতম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে ভর্তি হয়ে দরসে নিজামীর নিয়মানুসারে পাঠ্যসূচির সকল কিতাবাদী অধ্যয়নের পর অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে ফারেগ হন। পরবর্তীতে দক্ষতা এবং কৃতিত্বের সহিত নিয়মিত প্রচেষ্টার ফলে নিজেকে একজন কালজয়ী সাধক ও অনুপম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি যেমন ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক তেমনি ছিলেন উম্মতের জন্য এক মহানুভব আধ্যাত্মিক রাহবার। এক কথায় শিক্ষকতা, আধ্যাত্মিকতা, দাওয়াতী ফিকির ও মসজিদ মাদরাসা প্রতিষ্ঠাসহ দ্বীনের প্রতিটি শাখায় তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য ও তেজোদীপ্ত। তাঁর এই অমর কীর্তিগুলো চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিগত ৫/২/১১ ইং মোতাবেক রোজ শনিবার দিবাগত রাতে এশার নামাজ আদায় করে নিজ প্রয়োজনাদি থেকে ফারেগ হয়ে পবিত্র কাপড় পরিধান করে তিনি হাজারো লাখো ছাত্র, ভক্ত, মুরিদান ও মুহিব্বীনকে বিয়োগ বেদনার অপার সমুদ্রে ভাসিয়ে আল্লাহ আল্লাহ জপতে জপতে “রফীকে আ’লা” তথা উত্তম দোন্তের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্ষণিকের এই পৃথিবীকে জানায় চির বিদায়।
জামিয়ার চতুর্থ পরিচালক
জামিয়ার চতুর্থ পরিচালক হলেন কুতুবে আলম আল্লামা শাহ্ জমীর উদ্দীন (রহ.) এর সুযোগ্য জা-নশীন আল্লামা শাহ্ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী (দা.বা.)। জামিয়ার বর্তমান পরিচালক আল্লামা শাহ্ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী (দা.বা.) বিগত ৬/০২/২০১১ মরহুম পীর সাহেব (রহ.) এর ইন্তেকালের পর জামিয়ার মজলিসে শুরার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শুরার সকল সদস্যবৃন্দের সম্মতিক্রমে এবং জামিয়ার সকল শিক্ষক মহোদয়গণের আবেদনে শুরা মজলিসের সম্মানিত চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফি (রহ.) এর ফায়সালায় বর্তমান হযরতকে জামিয়ার বর্তমান মহাপরিচালক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণায় নানুপুরের হিতাকাঙ্খী এবং আপামর জনসাধারণ সকলেই যার পর নাই আনন্দিত, জামিয়ার উন্নতি ও অগ্রযাত্রার লক্ষ্যে তাঁর আকাঙ্ক্ষা পরিশ্রম সত্যি অনস্বীকার্য। তাই আমরাও দোয়া করি যেন আল্লাহ পাক হযরতের এ প্রচেষ্টাকে দীর্ঘতম করেন। আমীন।
জামিয়ার প্রথম শায়খুল হাদীস
জামিয়াতে সর্ব প্রথম দাওরায়ে হাদীস আরম্ভ হয় ১৩৯৩ হিজরীতে। তখন প্রথম শায়খুল হাদীস ছিলেন হযরত আল্লামা মাও. মাসউদুল হক (রহ.)। তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামস্থ পটিয়া থানাতে। তিনি প্রাথমিক লেখাপড়া জিরী মাদ্রাসা, পটিয়া এবং হাটহাজারী মাদরাসাতে করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষার জন্য দারুল উলূম দেওবন্দে যান। সেখানে দাওরায়ে হাদীস শেষ করেন। তারপর (মানতিক) দর্শনশাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জনের জন্য তৎকালীন প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক সেরা কেন্দ্র আজমিরে, মঈনুদ্দীন আজমীরী (রহ.) এর খেদমতে গমন করেন এবং সেখানে কয়েক বছর লেখাপড়া করে শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটান। তারপর দেশে ফিরে তিনি যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও জামিয়ায় হাদীস, তাফসীর, ফেক্বাহসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে তা’লীমী খেদমাত আঞ্জাম দেন। তাঁর খেদমত করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জামিয়া মাজহারুল উলূম চট্টগ্রাম, জামিয়া ইসলামিয়া চারিয়া, কৈগ্রাম জামিয়া ইসলামিয়া এবং জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অন্যান্য জামিয়া ব্যতীত নিছক অত্র জামিয়াতে সুদীর্ঘ ১৩ বৎসর বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেন। তিনি হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর খলীফা ছিলেন। তিনি শুধু হাদীস শাস্ত্রে নয় বরং যে কোন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। যে কোন প্রশ্নের তড়িৎ জবাব দেওয়ার ব্যাপারে তার নজীর তিনি নিজেই। তিনি এই জামিয়ার শায়খুল হাদীস থাকা অবস্থায় ৭ মাস যাবত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৫ ইং ২৪ আগস্ট এ নশ্বর দুনিয়া ত্যাগ করেন।
জামিয়ার দ্বিতীয় শায়খুল হাদীস
জামিয়ার দ্বিতীয় শায়খুল হাদীস ছিলেন কুতুবুল এরশাদ আল্লামা শাহ্ সোলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)। তিনি পূর্ণ একটি বছর এই মহান দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, তার পরিচিতি পূর্বে বর্ণিত জামিয়ার দ্বিতীয় পরিচালক শিরোনামে দ্রষ্টব্য।
জামিয়ার তৃতীয় শায়খুল হাদীস
জামিয়ার তৃতীয় শায়খুল হাদীস হিসেবে নিযুক্ত হোন, হযরত আল্লামা হাফেজ হারুন সাহেব (রহ.)। তিনি ১৯২৯ ইং চট্টগ্রাম শাহনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হেফজ এবং জামাতে শশুম পর্যন্ত নাজিরহাট বড় মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। তারপর জামাতে পাঞ্জুম থেকে দুওম পর্যন্ত চট্টগ্রাম জিরি মাদ্রাসায় লেখা পড়া করেন। অতঃপর দুই বছর হাটহাজারী মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। এরপর আরো উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভারতের প্রসিদ্ধ দ্বীনি মাদ্রাসা দারুল উলূম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে দাওরায়ে হাদীস শেষ করে এক বছর তাফসীর পড়েন। তারপর তিনি শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি ভারতের প্রসিদ্ধ মালদা নামক স্থানে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তিনি বুখারী শরীফ এবং তিরমিযী শরীফ পড়ান। সেখান থেকে এক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন চাঁদপুর ফরিদগঞ্জে পড়ান। তারপর ঢাকা লালবাগ মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে নিযুক্ত হোন। অতঃপর চট্টগ্রাম বাবুনগর মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসাবে নিযুক্ত হন। এরপর জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়াতে চলে আসেন। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর পর্যন্ত এই জামিয়ায় বুখারী শরীফের দরস দেন। ২৯/০৭/২০০৮ ইং তারিখে বার্ধক্যজনিত রোগে ইহজগৎ ত্যাগ করেন।
জামিয়ার চতুর্থ শায়খুল হাদীস:
জামিয়ার চতুর্থ শায়খুল হাদীস ছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন ফক্বিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.)। তিনি ১৯২৫ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ইমামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাজিরহাট ও হাটহাজারী মাদরাসায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক লেখাপড়া সমাপ্তির পর দারুল উলূম দেওবন্দে গমন করেন। ১৯৫০ সালে সেখানে ক্বওমী মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদীস কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। দারুল উলূম দেওবন্দের ইফতা বিভাগের তিনি প্রথম ডিগ্রি লাভকারী মুফতী। দেশে ফেরার পর পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হযরত মুফতি আজিজুল হক রহ. এর আহ্বানে তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তার কর্ম জীবনের শুভ সূচনা করেন। এরপর তিনি একাধারে জামিয়ার প্রধান মুফতি, সহকারী মহাপরিচালক ও শিক্ষা বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দাওরায়ে হাদীসের সর্বোচ্চ কিতাব বুখারী শরীফ ১ম খণ্ডের পাঠদান করেন। ১৯৯১ সালে তিনি রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চ শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নাম দেন মারকাযুল ফিকরিল ইসলামি। এটি বর্তমানে পুরো উপমহাদেশে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম, ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মাদ্রাসার মোহতামিম ও শায়খুল হাদীস ছিলেন। তিনি পূর্ণ একটি বৎসর অত্র জামিয়ার শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ১০ নভেম্বর ২০১৫ ইংরেজি তারিখে ইন্তিকাল করেন।
জামিয়ার পঞ্চম শায়খুল হাদীস
জামিয়ার পঞ্চম শায়খুল হাদীস ছিলেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা ইয়ার মুহাম্মদ সাহেব (রহ.)। তিনি শায়খুল ইসলাম আল্লামা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ও আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী (রহ.) এর অন্যতম ছাত্র ছিলেন।
ইউসুফ বান্নুরী রহ. তাকে সহস্তে লিখিত ইলমে হাদীসের বিশেষ সনদ প্রদান করেন। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ ও বিন্নুরী টাউন থেকে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করে বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জিরি মাদ্রাসায় সর্বপ্রথম পাঠদানে আত্মনিয়োগ করেন। অতঃপর বাবুনগর ও নাজিরহাট মাদ্রাসায় অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং এখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইলমে হাদীসের খেদমত আঞ্জাম দেন। এক পর্যায়ে তিনি পূর্ণ এক বৎসর এ জামিয়ার শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৪ ইংরেজিতে ইহকাল ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
জামিয়ার ৬ষ্ঠ শায়খুল হাদীস
জামিয়ার ৬ষ্ঠ শায়খুল হাদীস ছিলেন, বহুগ্রন্থ প্রণেতা উস্তাযুল আসাতেযা হযরত আল্লামা শেখ আহমদ সাহেব দা.বা.। তিনি ১৪২৭ হিজরীতে এই জামিয়ায় আসেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম কেরামত আলী। তিনি হাটহাজারী থানার মিরেরখীল গ্রামে ১৯৫০ইং সনের ১৫ ই জানুয়ারীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে লেখাপড়া করেন। তাঁর উস্তাদের মধ্যে আবুল হাসান (সাহেবে তানযীমুল আশতাত), মরহুম মাও. আব্দুলবারী (রহ.), হযরত মাও. আব্দুল কাইয়ুম (রহ.) হাফেজুর রহমান রহ., মুফতী আহমুদুল হক রহ., হযরত মাও. আহমদ শফী সাহেব রহ. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি প্রায় ৩৫ বছর উম্মুল মাদারেস দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১১ বছর অত্র জামিয়াতে শাইখুল হাদীস হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
জামিয়ার বর্তমান শায়খুল হাদীস:
৬ষ্ঠ শায়খুল হাদীসের পর জামিয়ার বর্তমান শায়খুল হাদীস হিসেবে নিযুক্ত হোন, জামিয়ার বর্তমান মুহতামিম পীরে কামেল আল্লামা শাহ্ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী দা.বা. উল্লেখ্য যে, হযরত পীর সাহেব (হাফিজাহুল্লাহ্) জামিয়ার বর্তমান শায়খুল হাদীস পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও হযরতের প্রাতিষ্ঠানিক ও দাওয়াতী নানাবিদ ব্যস্ততা থাকার দরুন তিনি বুখারী শরীফের শুরু ও শেষের দরস প্রদান করে থাকেন। বাকি বুখারী শরীফের পূর্ণাঙ্গের দরস প্রদান করে থাকেন জামিয়ার শায়খুল হাদীস ও উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগীয় প্রধান, উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান হাদীস বিশারদ ও ইসলামী স্কলার আল্লামা শাহ্ জমীর উদ্দীন (রহ.) এর সুযোগ্য সাহেবজাদা ও আস্থাভাজন খলীফা বহুগ্রন্থ প্রণেতা হযরতুলহাজ্ব আল্লামা মুফতী কুতুবুদ্দীন নানুপুরী সাহেব (দা.বা.)। আল্লাহ তা’আলার দরবারে আমরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। যেন আমরা হযরতের ইলম থেকে আরো বেশি বেশি উপকৃত হতে পারি। আমীন।