হিজড়া সম্প্রদায় আল্লাহ তাআলারই বান্দা বা বান্দি। তারা আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি। তারাও আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। তাদের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তারাও মানুষ। আমাদের মতই মানুষ। তবে যেমন অনেক মানুষের শারীরিক ত্রুটি থাকে। এটিও তাদের তেমনি একটি ত্রুটি। এ ত্রুটির কারণে উক্ত ব্যক্তি মনুষত্ব থেকে বের হয়ে যায় না। বরং অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মতই তারা আরো বেশি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের ঘৃণা নয় ভালবাসা ও স্নেহ দিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে দেয়া উচিত। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, খারাপ মন্তব্য করা মারাত্মক গুনাহের কাজ। যেকোন মুসলমানকে গালি দেয়া যেমন পাপ, তাদের গালি দেয়া তার চেয়ে কম পাপ নয়। তাদের এ দুর্বলতার কারণে তাদের ঠাট্টা করা মানে হল আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকে ঠাট্টা করা। তাই এটি খুবই গর্হিত গুনাহের কাজ। তাদের অধিকার ও সম্মান বজায় রাখার জন্য ইসলামে তাদেরকে কী সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং তাদের কী অধিকার ইসলাম রেখেছে? এ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান রাখার প্রয়োজন।
হিজড়ার পরিচয়
হিজড়া হচ্ছে বিশেষ লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষ, যার লৈঙ্গিক গঠন অনুপযোগী, বিকলাঙ্গ অথবা উভয়লিঙ্গ বা খোঁজা পুরুষ, যারা না পুরুষ না নারী। শরিয়তের পরিভাষায় হিজড়ার পরিচয় দিতে গিয়ে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন:
يَعْنِي الْخُنْثَى مَنْ لَهُ فَرْجُ الْمَرْأَةِ وَذَكَرُ الرَّجُلِ، وَظَاهِرُ عِبَارَةِ الْمُؤَلِّفِ أَنَّهُ لَا بُدَّ مِنْ الْآلَتَيْنِ (هُوَ مَنْ لَهُ فَرْجٌ وَذَكَرْ) … قَالَ الْبَقَالِيُّ أَوْ لَا يَكُونُ فَرْجٌ وَلَا ذَكَرٌ وَيَخْرُجُ بَوْلُهُ مِنْ تَقْبِ فِي الْمَخْرَجِ أَوْ غَيْرِهِ
যে ব্যক্তির মাঝে পুরুষ ও মহিলা উভয়লিঙ্গের আলামত বিদ্যমান থাকে, তাকে হিজড়া বলা হয়। যদি কোন লিঙ্গই ” না থাকে, শুধু প্রশ্রাবের জন্য ছিদ্রপথ থাকে, তাহলে তাকেও হিজড়া বলা হয়”। (আল বাহরুর রায়েক্ব, ৮/৫৩৮, দারুল কিতাবিল ইসলামী)
সংক্ষেপে একই দেহে স্ত্রী এবং পুংচিহ্ন যুক্ত অথবা উভয় চিহ্নবিযুক্ত মানুষই হলো লিঙ্গ প্রতিবন্ধী বা হিজড়া। (কামুসুল ফিকহ : ৩/৩৭৭)
ফুকাহায়ে কিরাম তাদের রচনাবলীতে বাবুল খুনসা (হিজড়া অধ্যায়) শিরোনামে স্বতন্ত্রভাবে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, হিজড়া তিন ধরনের হয়ে থাকে।
(ক) কারো মধ্যে পুরুষালী লক্ষণ প্রবল,
(খ) কারো মধ্যে মেয়েলী লক্ষণ প্রবল
(গ) কারো মধ্যে উভয় লক্ষণই সমান।
এদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিকে পুরুষ এবং দ্বিতীয় শ্রেণিকে নারী গণ্য করা হবে। আর তৃতীয় শ্রেণি প্রকৃত হিজড়া। দীনের সাধারণ বিষয়গুলো এদের সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। পক্ষান্তরে নারী-পুরুষ ভেদে যেসব বিধানে পার্থক্য আছে সেগুলো তারা উপরোক্ত শ্রেণিভেদ অনুযায়ী পালন করবে। বাকী যারা প্রকৃত হিজড়া তাদের বিস্তারিত বিধি-বিধান কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিম্নে আলোচনা করা হবে।
হিজড়াদের লিঙ্গ নির্ধারণের পদ্ধতি
হিজড়াদের নারীত্ব বা পুরুষত্ব নির্ধারণের উপায় কী হবে? এ ব্যাপারে ইসলাম একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেটা হলো, দেখতে হবে হিজড়ার প্রস্রাব করার অঙ্গ কোনটি? সে কি পুরুষালী গোপনাঙ্গ দিয়ে প্রস্রাব করে না কি মেয়েলী গোপনাঙ্গ দিয়ে প্রস্রাব করে? যদি পুরুষালী অঙ্গ দিয়ে পেশাব করে তবে সে পুরুষ। আর যদি মেয়েলী অঙ্গ দিয়ে পেশাব করে তবে সে নারী। হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন-
بال من مجرى الذكر فهو غلام، وإن بال من مجرى الفرج فهو جارية
‘উভয়লিঙ্গের বাচ্চা পুরুষাঙ্গ দিয়ে পেশাব করলে ছেলে, আর যোনিপথে পেশাব করলে মেয়ে হিসেবে পরিগণিত হবে।’
[আসসুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী, হাদীস: ১২৫১৫, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস: ১৯২০৪]
আর যদি কারো উভয় গুপ্তাঙ্গ থেকেই পেশাব নির্গত হয় তাহলে আগে যে অঙ্গ থেকে পেশাব বের হবে তার হিসাবে তার লিঙ্গ নির্ণীত হবে। সে অঙ্গটি যদি পুরুষালী হয় তাহলে পুরুষ, আর মেয়েলী হলে মেয়ে বলে গণ্য হবে।
বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহ. বলেন-
فإن بال منهما جميعا يورث من حيث يسبق
‘যদি উভয়লিঙ্গের বাচ্চা তার উভয় গুপ্তাঙ্গ দিয়েই পেশাব করে তবে যে অঙ্গ থেকে আগে পেশাব নির্গত হবে সে হিসেবে সে মিরাস পাবে।’ [সুনানে বায়হাকী, হাদীস: ১২৫১৬]
প্রস্রাব নির্গত হওয়ার পথের মাধ্যমে হিজড়ার লিঙ্গ নির্ধারণের উপরোক্ত পদ্ধতি কেবল বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আর এ পদ্ধতি কার্যকর হবে না। সেক্ষেত্রে হিজড়ার দেহের বাহ্যিক অবয়ব ও নিদর্শনের মাধ্যমে তার পুরুষ বা নারী হওয়ার ফয়সালা করা হবে। যদি তার মধ্যে পুরুষের নিদর্শন বিদ্যমান থাকে যেমন, দাড়ি-গোঁফ হওয়া, স্ত্রী-সহবাসে সক্ষম হওয়া এবং স্বপ্নদোষ হওয়া ইত্যাদি তাহলে সে পুরুষ বলে বিবেচিত হবে। আর যদি তার মধ্যে মেয়েদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে যেমন, ঋতুস্রাব হওয়া, স্তন হওয়া বা স্তনে দুধ আসা, যোনিপথে যৌনসংগম করতে সক্ষম হওয়া এবং গর্ভবতী হওয়া ইত্যাদি তাহলে সে নারী হিসেবে পরিগণিত হবে। আর যদি উল্লেখিত কোনো আলামতই তার দেহে প্রকাশ না পায়, তাহলে তাকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হবে। কেননা মেয়েলী কোনো আলামত প্রকাশ না পাওয়াই একথার প্রমাণ যে, সে পুরুষ। সুতরাং পুরুষ হিসেবেই তার উপর শরয়ী বিধান আরোপিত হবে।
অতএব নামায-রোযা, হজ্জ-উমরা, বিয়ে-শাদী ও পর্দাপুশিদাসহ ইসলামের সকল বিধিবিধান তাদের উপর নারী ও পুরুষ হিসেবেই বর্তাবে। তদ্রূপ কোনো মুসলমান হিজড়া মারা গেলে তার বাহ্যিক অবয়বের ভিত্তিতে তার লাশের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। তার দৈহিক অবয়ব যদি পুরুষের ন্যায় হয় তাহলে তাকে গোসল দেয়া, কাফন পরানো, দাফন করা ও জানাযার নামাযসহ সবই পুরুষের মত করা হবে। আর তার অবয়ব নারী সদৃশ এবং তার মধ্যে মেয়েলি নিদর্শন প্রবল হলে উল্লেখিত সকল ক্ষেত্রে মহিলা মাইয়্যেতের বিধান প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় ও জান্নাত জাহান্নামও তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। [বাদায়েউস সানায়ে ৭/৩২৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৬/৪৩৮; রদ্দুল মুহতার ৬/৭২৭; ফাতাওয়া দারুল উলুম যাকারিয়া ৮/৪০৩; ফাতাওয়া আবদুল হাই লাখনবী, পৃ. ৪০১; ফাতাওয়া অযীযিয়্যাহ, পৃ. ৫৩৯; ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া, পৃ. ৪৬৫, আল মুগনী, ইবনে কুদামা, ৭/২০৮)
শরয়ী অধিকারে লিঙ্গ প্রতিবন্ধী বা হিজড়া
মানবাধিকার সম্পর্কে ইসলামের ধারণা সুস্পষ্ট। কারণ ইসলাম আসার পূর্বে মানব গোষ্ঠী ছিল উপেক্ষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত আর সর্বপ্রকার অধিকার বঞ্চিত। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একমাত্র ইসলামই মানবাধিকার ও সার্বজনীন মৌলিক স্বাধীনতা প্রদান করেছে। ইসলাম যেভাবে পুরুষের জন্য নারীর আর নারীর জন্য পুরুষের সকল অধিকার সুষম হারে বণ্টন করেছে, ঠিক তেমনিভাবে নিশ্চিত করেছে সর্বক্ষেত্রে লিঙ্গ প্রতিবন্ধীর অধিকার এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়াদি। তুলে ধরেছে ইসলামের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। আজ সমাজে যাদেরকে আমরা লিঙ্গ প্রতিবন্ধী বা হিজড়া বলে জানি তারাও আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টি। তারা আল্লাহ তা’আলারই বান্দা। তারাও আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। যার ঘোষণা স্বয়ং রাব্বুল ‘আলামীন পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন,
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি, তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি। আর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের উপরই তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বদান করেছি”। (সূরা বানী ইসরা-ঈল ১৭: ৭০)
মানব মর্যাদার মানদণ্ড আর প্রকৃত মাপকাঠি কোনো বংশ, গোত্র, অঞ্চল, বর্ণ, ভাষা, সৌন্দর্য, সুস্থতা আর নারী-পুরুষের তারতম্যের ভিত্তিতে নিরূপণ হয় না। একমাত্র তাকওয়াই হচ্ছে এ মর্যাদার মাপকাঠি।
হিজড়ারা সমাজে অবহেলিত
হিজড়ারা আমাদের সমাজের বাইরের কেউ নয়। তাদের সব মানবিক অধিকার রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। তাদের সমাজচ্যুত করা ইসলাম অনুমোদন করে না। আমাদের সমাজে পর্যাপ্ত ইসলামি জ্ঞান না থাকায় এবং নানা কুসংস্কার, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক দৈন্যতার কারণে হিজড়ারা বঞ্চিত ও অবহেলিত। ক্ষেত্র বিশেষ নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার।
আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে মানবজাতি আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা। তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ তা’আলার এ সৃষ্টি জগত বড় ব্যাপক ও বিস্তৃত। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন,
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“তিনিই মহান সত্তা; মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। (‘সূরা আলে ইমরান’- ৬)
তিনি মানবজাতির কাউকে পুরুষ, কাউকে নারী, আবার তাঁর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ কাউকে বানিয়েছেন একটু ভিন্ন করে, যেন বান্দা তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে যে তিনি সব বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি যেমন স্বাভাবিক সুন্দর সৃষ্টি করতে সক্ষম, তেমনি এর ব্যতিক্রম সৃষ্টি করতেও সক্ষম। আর এমনই এক বৈচিত্রময় সৃষ্টি লিঙ্গ প্রতিবন্ধী বা হিজড়া। তারা পূর্ণাঙ্গদের ন্যায় সমান মর্যাদার অধিকারী মানব। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় হিজড়াদের সম্পূর্ণ ভিন্ন নজরে দেখা হয়। তাদেরকে অর্থ-সম্পদ, পরিবার ও সমাজ এবং রাষ্ট্র কোনো ক্ষেত্রেই তাদের প্রাপ্য অধিকার দেয়া হয় না। বরং তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়। তাদের প্রতি ঘৃণা ও দুর্ব্যবহার করা হয়। পরিবারে হিজড়া সন্তানকে জীবন্ত অভিশাপ মনে করা হয়। ফলে তাদেরকে এক সময় মনুষ্য সমাজ থেকেই বের করে দেয়া হয়। এভাবে তারা এক প্রকার স্বজন ও সম্বলহীন জীবন যাপন করে।
আমাদের সমাজব্যবস্থা জোর করে হিজড়াদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখে। সামাজিক সম্মান, শিক্ষা, কর্ম, বাসস্থান ইত্যাদির নূন্যতম অধিকার এ সমাজ থেকে তাদের দেয়া হয় না। সত্যিকারার্থে তারা প্রতিবন্ধী হলেও প্রতিবন্ধীদের দেয়া সুযোগ-সুবিধাটুকুও তাদের দেয়া হয় না। আমাদের এ অবক্ষয়ের জন্য দায়ী আমাদের কুসংস্কার ও ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। অথচ ইসলামী শারী’আহ্ অনুযায়ী হিজড়াগণ সাধারণ মানুষের মতই তাদের পূর্ণ অধিকার লাভকরবে। লেখা-পড়া, শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরী-বাকরী, ব্যবসা-বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, সম্পদের মালিকানা; ধর্ম-কর্ম, সামাজিক ও উন্নয়ন কাজের সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রেই তাদের ন্যায্য অধিকার ইসলাম স্বীকার করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা আলাদা কোনো লিঙ্গ নয়; বরং ইসলাম আধুনিক-বিজ্ঞানের মতই তাদেরকেও নারী ও পুরুষের অন্তর্ভুক্ত করেছে। হাদীসে স্পষ্টভাবে হিজড়াদের আলোচনা এসেছে এবং কতিপয় বিধানও বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন,
عن بن عباس أن رسول الله صلى الله عليه و سلم سئل عن مولود ولد له قبل وذكر من أين يورث فقال النبي صلى الله عليه و سلم : يورث من حيث يبول
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো এক গোত্রের নবজাতকের মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, যে নারী-পুরুষ কোনোটিই নয়। উত্তরে তিনি বললেন, তার প্রস্রাবের পথকে কেন্দ্র করে তার মীরাস প্রাপ্তির বিষয়টি নির্ণীত হবে”। (সুনানে বাইহাকী কুবরা, ৬/২৬১) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে-
أن عليا رضي الله عنه سئل عن المولود لا يدري أرجل أم امرأة فقال علي رضي الله عنه : يورث من حيث يبول
“হযরত আলী রাযি. কে যে নবজাতকের নারী-পুরুষ হওয়ার বিষয় স্পষ্ট নয় তার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এমন শিশুর প্রস্রাবের অবস্থা নির্ণয় করে বিধান আরোপিত হবে”। (সুনানে বাইহাকী কুবরা; হা.নং ১২২৯৪) এছাড়াও অসংখ্য হাদীস এবং আছারে হিজড়া সংক্রান্ত বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। আর এগুলোর আলোকেই ফুক্বাহায়ে কেরাম ফিকহের কিতাবাদিতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হিজড়াদের জন্য শরয়ী সমাধান ও মাসআলা-মাসাইল বর্ণনা করেছেন।
হিজড়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুশাসন
পিতা-মাতা, অভিভাবক ও সমাজের দায়িত্ব হল, অন্য সাধারণ সুস্থ্য সন্তানদের মত হিজড়া সন্তানকেও যথাযথ গুরুত্বের সাথে লালন-পালন করা। তার আবাসন ও আদর্শ শিক্ষকের ব্যবস্থা করা। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও মুকাল্লাফ বা আল্লাহর বিধান পরিপালনে আদিষ্ট। সাধারণ মানুষের মতো তাদেরও নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত আদায় করতে হবে। এ জন্য পরকালে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। যার ভেতর নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য প্রবল সে নারী হিসাবে এবং যার ভেতর পুরুষের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য প্রবল, সে পুরুষ হিসাবে ইসলামের বিধান মান্য করবে। আর যার মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্যই প্রবল নয়, সে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নারী বা পুরুষ হিসাবে ইসলামের বিধান মান্য করবে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভেতর যেমন ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধের অভাব রয়েছে, তেমনি তাদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার বিশেষ কোনো উদ্যোগ সমাজে চোখে পড়ে না। অথচ প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা তাদের ওপরও ফরজ এবং তাদের এ ফরজ জ্ঞানার্জনের সুযোগ করে দেওয়া সমাজের অন্য শ্রেণির মানুষের দায়িত্ব।
প্রকৃত হিজড়াদের বিস্তারিত শরয়ী বিধি-বিধান
হিজড়াদের ইবাদত
ফকিহগণ হিজড়াকে দুই ভাগে বিভাজিত করেছেন। যথা- নারী হিজড়া ও পুরুষ হিজড়া। অর্থাৎ- পুরুষ হিজড়া হলো অপূর্ণ পুরুষ আর নারী হিজড়া হলো অপূর্ণ নারী। ঈমান, ইসলাম, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত এমনকি বিয়ে-শাদীসহ সকল ইসলামী বিধিবিধান হিজড়াদের উপর (নারী ও পুরুষ হিসেবেই) বর্তাবে। অনুরূপভাবে হালাল হারাম, ন্যায় অন্যায় ও জান্নাত জাহান্নামও তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। (ফাতাওয়ায়ে আযীযিয়্যাহ, শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী : পৃ.৫৩৯, ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া, পৃ.৪৬৫)
সুতরাং, বলা যায় যে, ইসলাম নারী ও পুরুষের অধিকার যেমন সুনিশ্চিত করেছে তেমনি হিজড়াদেরও অধিকার থেকে বঞ্চিত করেনি। তাদের জন্য আল্লাহ তা’আলা মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধান দিয়েছেন। তারা মহান রবের ‘ইবাদত-আরাধনা ও বন্দনা করবে। মহান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পিত করবে। তারাও অন্যদের মতো রীতিমত নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি ‘ইবাদত পালন করবে। অন্যরাও যেমন পূণ্য লাভ করে তারাও সেভাবে লাভ করবে। তারাও কল্যাণে-অকল্যাণে সমান অংশীদার।
আযান-ইকামত
ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, এ শ্রেণীর লিঙ্গ প্রতিবন্ধীর আযান দেয়া সহীহ নয়। কেননা সে পুরুষ কিনা এটা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। আর যদি নারী হয় তবে তার আযান সহীহ নয়। অধিকন্তু আযান মূলত বিধিত হয়েছে এ’লান তথা নামাযের ঘোষণা উচ্চস্বরে দূরদূরান্তে পৌঁছে দেয়ার জন্যই। আর এ দু’টির কোনোটিই নারীদের জন্য শরীয়তসম্মত নয়। তদ্রূপ যার জন্য আযান দেয়া বৈধ নয় তার জন্য ইকামত দেয়ারও কোনো অনুমতি নেই। (সুনানে বাইহাকী, ১/৪০৮, আলমুগনী, ১/৫৩০, আল-মউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুওয়াইতিয়্যাহ, ২০/২২)
ইমামত
এমন হিজড়াদের জন্য কোনো পুরুষ বা তার মত অন্য কোন হিজড়ার ইমামতি করা জায়েয নেই। শুধু নারীদের ইমামতি করার সুযোগ আছে। তবে এক্ষেত্রেও মাকরূহ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। নারীদের ইমামতি করার ক্ষেত্রে তাকে নারীদের সামনে দাঁড়াতে হবে; তাদের মাঝে নয়। কেননা তার পুরুষ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। (আল-মউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুওয়াইতিয়্যাহ, ২০/২৫)
নামাযে দাঁড়ানো এবং ওড়না পরিধান করা
জামাআতে নামায আদায় করার ক্ষেত্রে এ শ্রেণীর হিজড়াগণ পুরুষের পিছনের কাতারে দাঁড়াবে এবং নামাযে তারা ওড়না ব্যবহার করবে। আর নামাযে বসার ক্ষেত্রে নারীদের ন্যায় বসবে। (আলবাহরুর রায়েক, ৯/৩৫, ৩৬, বাদায়েউস সানায়ে’, ৭/৩২৮-কিতাবুল খুনছা, কামুসুল ফিকহ, ৩/৩৭৯, কিতাবুল আসল লিল ইমাম মুহাম্মাদ, ৯/৩২৪)
হিজড়াদের হজ্ব পালনের বিধান
এ ধরনের হিজড়াগণ হজের সকল বিধি-বিধান নারীদের ন্যায় পালন করবে এবং মাহরাম কোনো পুরুষ ছাড়া তাদের হজ করার অনুমতি নেই। নারী হিজড়ারা সাধারণ নারীদের মতো এবং পুরুষ হিজড়ারা সাধারণ পুরুষের মতো হজ্জব্রত পালন করতে পারবেন। হজ্জ আদায়কালে ছেলে হিজড়াদের পুরুষদের মতো ইহরাম পরতে হবে এবং মেয়ে হিজড়া নারীদের মতো পোশাকেই ইহরামের নিয়ত করবেন। মূলতঃ হিজড়াগণ হজ্জের সকল বিধি-বিধান নারীদের ন্যায় পালন করবে এবং মাহরাম কোনো পুরুষ ছাড়া তাদের হজ্জ করার অনুমতি নেই। (ফাতহুল কাদীর, ১০/৫৫৩, আলবাহরুর রায়েক, ৯/৩৩৬)
অলঙ্কার পরিধান করা
তাদের জন্য সব ধরনের অলঙ্কার পরিধান করা মাকরূহ। কারণ পুরুষের জন্য অলঙ্কার পরিধান করা হারাম আর নারীদের জন্য মুবাহ তথা অনুমোদিত। আর হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা ফরয এবং মুবাহ কাজ করা জায়েয। অর্থাৎ এমন কাজ করার দ্বারা কোনো সওয়াব হবে না এবং না করার দরুণ কোনো গুনাহ হবে না। সুতরাং হিজড়ার বিষয়টি অস্পষ্ট, বিধায় সতর্কতা অবলম্বন করতঃ অলঙ্কার পরিধান না করা উচিত। (আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/৩০, ঈনায়া আলা ফাতহিল কাদীর, ১০/৫৫২, বাদায়িউস সানায়ি’ ৭/৩২৯, রদ্দুল মুহতার, ৬/৭২৯-কিতাবুল খুনছা)
খতনা বিধান
কোনো পুরুষের মাধ্যমে হোক কিংবা নারীর মাধ্যমে, নাবালেগ অবস্থায়ই তাকে খতনা করিয়ে দিতে হবে। আর যদি সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর খাতনা করতে চায়, তাহলে খতনা করাতে পারে এমন কোনো নারীর সাথে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিবে। নতুবা সে খতনা বিহীন জীবন যাপন করবে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর পুরুষের মাধ্যমে হোক কিংবা নারীর মাধ্যমে হোক সর্বাবস্থায় তার জন্য খতনা করানো মাকরূহ। কারণ খতনা করা একটা সুন্নাত আমল। আর এক্ষেত্রে তা পালন করতে গেলে ফরয আমল লঙ্ঘন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। বিধায় সে খতনাবিহীন জীবন যাপন করবে। (বাদায়েউস সানায়ে’, ৭/৩২৮-কিতাবুল খুনছা, আলবাহরুর রায়েক্ব, ৮/৫৩৯-কিতাবুল খুনছা, ফাতাওয়া শামী, ১০/৪৪৮, কামুসুল ফিকহ, ৩/৩৭৮, আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/৩০)
সতর ও পর্দা বিধান
এমন লিঙ্গ প্রতিবন্ধীর সতর নারীদের সতরের ন্যায় এবং তারা নারীদের মতোই পর্দা বিধান মেনে চলবে। তাছাড়া তারা কোনো পুরুষ বা নারীর সামনে ইস্তিঞ্জা এবং গোসলের জন্য সতর খুলবে না। অর্থাৎ এক কাপড় পরিহিত অবস্থায় থাকবে না এবং গাইরে মাহরাম কোনো নারী-পুরুষ তার সাথে নির্জনতা অবলম্বন করবে না। কোনো হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বা অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কতার জন্য মাহরাম কোনো পুরুষ ব্যতীত দূরে কোথাও সফরে বের হবে না। এমনকি শুধু মাহরাম মহিলাদের সাথে সফর করাও মাকরূহ। (আলবাহরুর রায়েক, ৯/৩৩৬, আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২৬, রদ্দুল মুহতার, ১০/৪৪৯)
বিবাহ-শাদী
এ শ্রেণীর হিজড়াকে যদি কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় আর উক্ত পুরুষের জন্য তার সাথে সহবাস করা সম্ভব হয়, তাহলে উক্ত বিবাহ বহাল থাকবে। এমনিভাবে সে যদি কোনো নারীকে বিবাহ করে এবং সে নারীর সাথে সহবাস করতে সক্ষম হয় তাহলেও উক্ত বিবাহ বহাল থাকবে। আর যদি সে সহবাসে সক্ষম না হয় এবং স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হয়, তাহলে আদালত স্বামীকে এক বছর সময় দিবে। উক্ত সময়ের মধ্যেও যদি সে সহবাসে সক্ষম না হয় তাহলে আদালত তাদের মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদ করে দিবে। (কিতাবুল আসল লি ইমাম মুহাম্মাদ, ৯/৩২৩, আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২৭, তাবঈনুল হাক্বাঈক-৬/২১৮, আল আশবাহ-ইবনু নুজাইম, ৩৮২,)
বিচার-ফয়সালা এবং সাক্ষ্যদান
এ শ্রেণীর হিজড়ারা সাক্ষ্যদান এবং বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রেও নারীদের আওতাভুক্ত। একজন পুরুষ এবং একজন নারীর সাথে তার সাক্ষ্য একজন নারীর ন্যায় গণ্য হবে। (আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২৮)
স্বীকারোক্তি গ্রহণ
এরা যদি নিজের ব্যাপারে কোনো কিছুর স্বীকারোক্তি প্রদান করে, যার দরুণ তার উত্তরাধিকার অথবা দিয়ত তথা রক্তপণ হ্রাস পায় তাহলে তা গ্রহণ করা হবে। আর যদি এমন দাবী করে যার দ্বারা এগুলো বৃদ্ধি পায় তবে তা গ্রহণ করা হবে না। কারণ এ ব্যাপারে সে অন্যকে দোষারোপকারী। বিধায় অন্যের ব্যাপারে তার কথা গ্রহণ করা হবে না। আর ইবাদত এবং অন্যান্য বিষয়ে তার কথা গ্রহণ করা করা হবে। কেননা ইবাদতের বিষয়টি বান্দা এবং আল্লাহ তা’আলার মধ্যকার ফয়সালার বিষয়। (আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২৮, আলমুগনী, ৬/৭৭, ৪/৪৬১, ৪৬২)
গোসল ও কাফন-দাফন
এ ধরনের প্রকৃত হিজড়াদের ইন্তিকালের পর কোনো নারী-পুরুষ তাদেরকে গোসল দিবে না; বরং তায়াম্মুম করিয়ে দিবে। এক্ষেত্রে যে তায়াম্মুম করাবে সে যদি হিজড়ার মাহরাম না হয় তাহলে হাতে কোনো কাপড় পেঁচিয়ে নিবে। কারণ পুরুষের জন্য কোনো নারীকে এবং নারীর জন্য কোনো পুরুষকে গোসল দেয়া শরীয়তসম্মত নয়। একজন মুসলিম হিসেবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার জানাযার নামায পড়া হবে এবং তাকে নারীদের ন্যায় পাঁচ কাপড়ে কাফন পরানো হবে। কেননা সে যদি নারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তো সুন্নাতসম্মত পন্থায় কাফন পরানো হলো। আর যদি পুরুষের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই। কারণ পুরুষ তার জীবদ্দশায় তিনের অধিক কাপড়ও পরিধান করে। দাফনের সময় মাহরাম ব্যক্তিই তাকে কবরে নামাবে এবং চাদর ইত্যাদি দ্বারা তার কবরকে ঢেকে নিবে, এটা উত্তম এবং মুস্তাহাব। কেননা যদি সে প্রকৃতপক্ষে নারীর অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তো তা ওয়াজিবের পর্যায়ভুক্ত। আর যদি সে পুরুষের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে চাদর দ্বারা ঢাকার দরুণ কোনো সমস্যা হবে না। (ফাতাওয়া শামী, ১০/৪৫০, আলবাহরুর রায়েক, ৭/৩৩৭, কিতাবুল আসল লি ইমাম মুহাম্মাদ, ৯/৩২৩, বাদায়েউস সানায়ে’, ৭/৩২৮-কিতাবুল খুনছা, কামুসুল ফিকহ, ৩/৩৭৯)
উত্তরাধিকার বিধান
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে এমন প্রকৃত হিজড়াগণ নারী-পুরুষের প্রাপ্ত অংশের মধ্য হতে কম অংশ যেটা হবে তাকে তাই দেয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো মৃত ব্যক্তি এক ছেলে, এক মেয়ে এবং একজন হিজড়া সন্তান রেখে মারা যায়, তাহলে হিজড়াকে মেয়ের সমপরিমাণ অংশ দেয়া হবে। তদ্রূপ মৃত ব্যক্তি যদি এক ছেলে এবং এক হিজড়া রেখে মারা যায় তাহলে ছেলে পাবে দুই তৃতীয়াংশ সম্পদ আর হিজড়া পাবে এক তৃতীয়াংশ সম্পদ। (আলবাহরুর রায়েক্ব, ৮/৫৪৩-কিতাবুল খুনছা, ফাতাওয়া শামী, ১০/৪৫০, আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/৩২, আররাযী শরহে সিরাজী; পৃষ্ঠা-৯৪)
হিজড়াদের স্তন্যপান ও বৈবাহিক নিষিদ্ধতা
এমন প্রকৃত হিজড়ার স্তনে যদি দুধ আসে তবে তা কাউকে পান করানোর দ্বারা রাযাআত তথা বৈবাহিক নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হবে না। কেননা সে নারী (দুধমাতা) হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়; যা রাজাআত সাব্যস্ত হওয়ার পূর্বশর্ত। তবে যদি কোনো পুরুষ বা নারী তাকে উত্তেজনার সাথে চুমু দেয় তাহলে এর দ্বারা বৈবাহিক নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ- চুম্বনকারী পুরুষের জন্য হিজড়ার মা এবং নারীর জন্য এ হিজড়ার বাবাকে বিবাহ করা হারাম হয়ে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে শামী, ১০/৪৪৯, আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২৭)
অপারেশন-সার্জারির মাধ্যমে হিজড়ার লিঙ্গ পরিবর্তনের বিধান
শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো পরিপূর্ণ পুরুষ কিংবা মহিলার জন্য অপারেশন-সার্জারির মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরষ্পরের লিঙ্গ পরিবর্তন করা জায়েয নেই; বরং তা সুষ্পষ্ট হারাম। কেননা এভাবে লিঙ্গ পরিবর্তন করা আল্লাহ পদত্ত-সৃষ্টিগত জাতকে পরিবর্তন করার নামান্তর। যা কুরআন-হাদীসের আলোকে অকাট্য হারাম।
তবে যদি কোনো হিজড়া কিংবা কোনো পুরুষের মধ্যে জন্মগতভাবে কিংবা জন্মের পরবর্তী সময়ে মহিলাদের মত শারীরিক কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়, (যেমন: স্ত্রী লিঙ্গ দ্বারা প্রস্রাব করা, স্তন ওঠা, মাসিক হওয়া, গর্ভবর্তী হওয়া বা মহিলাদের মত অন্য কোনো রূপ ধারণ করা) অথবা কোনো মহিলার মধ্যে পুরুষদের মত শারীরিক কিছু নিদর্শন যদি থাকে, অথবা একই ব্যক্তির মধ্যে মহিলা ও পুরুষ উভয়ের কিছু নিদর্শন যদি পাওয়া যায়, তখন যেহেতু পুরুষের মধ্যে মহিলার নিদর্শন থাকা, কিংবা মহিলার মধ্যে পুরুষের নিদর্শন থাকা এক ধরণের শারীরিক ত্রুটি, তাই এ ধরণের দোষ-ত্রুটি থেকে পরিত্রাণের জন্য অপারেশন-সার্জারির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করে মূল লিঙ্গকে তার আসলরূপে প্রকাশ করে পরিপূর্ণ পুরুষ কিংবা নারীর রূপে রুপান্তরিত হওয়া জায়েয আছে। কেননা এর দ্বারা মূলত সৃষ্টিগত জাতকে পরিবর্তন করা হয় না; বরং মূল লিঙ্গকে চিকিৎসার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে আসল রূপে প্রকাশ করা হয়।
সুতরাং উল্লেখিত মূলনীতির আলোকে মুশকিল হিজড়ার ক্ষেত্রে সার্জারির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করলে সে একজন পরিপূর্ণ নারীর মত রূপ ধারণ করতে পারবে বলে মনে হলে বা অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে তা জানা গেলে এ ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করার অবকাশ রয়েছে। আর যদি এর দ্বারা বিশেষ কোনো উপকার না হয়, তাহলে লিঙ্গ পরিবর্তন না করে আপন অবস্থায় থেকে রোযা আদায় কিংবা যৌন চাহিদা দমে যায় এমন কোন ঔষধের মাধ্যমে ধৈর্য ধারণ করে জীবন-যাপন করবে। (মাবসূতে সারাখসী, ৩০/১৮৯-দারুল ফিকর, মাজমাউল আনহুর, ৮/৮৬৮-দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ফাতাওয়া হিনদিয়্যাহ, ৫/৩৬০-দারুল ফিকর, তাকমিলাতু ফতহিল মুলহিম, ৪/১৯৫)
উপসংহার
ইসলাম এসব হিজড়াদের সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। তাদেরকে সমাজ হতে আলাদা করা হয়নি। অতএব, তাদের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তারাও মানুষ। আমাদের মতই মানুষ। তবে যেমন অনেক মানুষের শারীরিক ত্রুটি থাকে। এটিও তাদের তেমনি একটি ত্রুটি। এ ত্রুটির কারণে তারা মনুষ্যত্ব থেকে বের হয়ে যায় না। বরং অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মতই তারা আরো বেশি স্নেহ, মমতা ও ভালবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে। উল্লেখ্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, হিজড়া হলো মনোদৈহিক বৈকল্য বা শরীরবৃত্তীয় ও মনোজাগতিক বিকাশের অপূর্ণতা। এটি হরমোন জনিত একটি সমস্যা। শরীরের যে হরমোনের কারণে একজন মানুষ পুরুষ বা নারী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়, সে হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকাই এর প্রধান কারণ। সুতরাং অত্যাধুনিক হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে এবং ক্ষেত্রবিশেষ শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে এর পুরোপুরি স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের সুচিন্তিত মতামত, পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, সরকারের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনের সদিচ্ছা ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সহযোগিতা। আল্লাহ তাআলা সকলকে সহীহ বুঝ দান করুন। আমীন।