الجامعة الإسلامية العبيدية نانوفور

জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর

Jamia Islamia Obaidia Nanupur

ফিলিস্তিনের ভূমি মুসলিম জাতির ঐতিহ্য ও অধিকার

হামদ ও সালাতের পর…

মসজিদে হারামের পর বিশ্ববাসীর ইবাদত ও হেদায়াতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আল্লাহ তায়ালা যেই মহিমান্বিত ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেন, সেটি ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত “মাসজিদে আকসা”। যুগ যুগ ধরে মুমিনদের আত্মার সঙ্গে এক গভীর ও চিরন্তন সম্পর্ক বজার রেখে আসছে এই মহান মসজিদটি। তার বহুযুগ পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে নির্মিত হয় ইসলামের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ মসজিদ “মসজিদে নববী”। যদিও তার নির্মিত সর্বপ্রথম মসজিদ হলো “মসজিদে কুবা”। যা তাঁর নবুওয়াতের সূচনা লগ্নের অন্যতম স্বারক/স্মৃতিচিহ্ন (হিসেবে গণ্য)। এই তিনটি মসজিদ “মসজিদে আল-হারাম, মসজিদে আকসা, ও মসজিদে নববী” অন্যান্য সকল মসজিদের তুলনায় অধিক ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়। এই মসজিদগুলোর সঙ্গে যার যতো বেশি গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে, তার ঈমানের দৃঢ়তা ও আমলের নূর তত বেশি বৃদ্ধি পায়।

ফিলিস্তিনের ভৌগলিক অবস্থান

ফিলিস্তিন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। পূর্বে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, জর্দান ও সৌদি আরব। পশ্চিমে মিসর। এই পুরো অঞ্চল তেলসমৃদ্ধ। ফিলিস্তিনের উত্তর-পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর। যার তীরে সাইপ্রাস, তুরস্ক, গ্রিসসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো অবস্থিত। ফিলিস্তিন এশিয়া ও আফ্রিকার দরজা। ফিলিস্তিন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে অবস্থিত। এটাই ফিলিস্তিনের একমাত্র ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নয়। এর আরও সুবিধা আছে ফিলিস্তিনের দক্ষিণ অংশ আকাবা উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্য জাহাজগুলো প্রথমে লোহিত সাগরে আসে তারপর সুয়েজ খাল পার হয়ে ভূমধ্যসাগরে যায়। ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্যের মেরুদণ্ড সুয়েজ খাল ফিলিস্তিন থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে। সে হিসেবে সুয়েজ খালে নজর রাখা কিংবা সুয়েজ খাল বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সাইপ্রাসের চেয়েও উত্তম জায়গা হচ্ছে ফিলিস্তিন। এছাড়া সুয়েজ খালের পরিবর্তে সুয়েজ খালকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যদি আরেকটি খাল খনন করতে হয় তাহলে তা শুধুমাত্র ফিলিস্তিনেই সম্ভব। কারণ মিসরের পর ফিলিস্তিনই একমাত্র দেশ যা একসঙ্গে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী।

ফিলিস্তিনের প্রথম বাসিন্দা ‘কেনআনীরা’

প্রাচীন যুগে “কেনআনীরা” এসে ফিলিস্তিনে বসবাস শুরু করে। এ জাতির প্রতিটি শাখা আরব বংশোদ্ভূত। জাযিরাতুল আরব থেকে তারা ফিলিস্তিনে অভিবাসন গ্রহণ করেছিল। তারা ছিল মূর্তিপূজারি। এতে ইহুদিরা যে দাবি করে, তারা ফিলিস্তিনের প্রথম বাসিন্দা- এর অসারতা প্রমাণ হয়। তাদের হাতে বিকৃত তাওরাতও স্বীকার করে যে, ইহুদিদের আগে কেনআনীরাই ফিলিস্তিনের বাসিন্দা ছিল। নাবলুস, বাইসান, আক্কা, আসকালান, হাইফাসহ দুই শতাধিক শহর তারা গড়ে তুলেছিল। ইহুদিদের ফিলিস্তিন প্রবেশের ১৪০০ বছর পূর্বে তারা আগমন করে। “আমোরীয়রা” ফিলিস্তিনে বসবাসকারী আরেকটি সম্প্রদায়। তারা এ শহরের নাম দিয়েছিল, উরসালিম। তাদের কয়েক শ’বছর পর ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে “ব্লেস্ট জনগোষ্ঠী”। তারাও ইহুদি ছিল না। তারা এ অঞ্চলের নাম রেখেছিল বালিস্তিন। সেখান থেকেই পরিবর্তন হয়ে ফিলিস্তিন হয়েছে।

ফিলিস্তিনে ইব্রাহীম আ. এর আগমন

২০০০-১৫৫০ খ্রিস্টপূর্ব অর্থাৎ ৪৫০ বছরের এই ধাপটি ফিলিস্তিনের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ যুগেই এখানে ইবরাহীম আ. এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম তাওহীদের প্রকাশ ঘটে। তিনি ছিলেন মুসলিম জাতির পিতা। খলীলুল্লাহ, আল্লাহর বন্ধু। তিনি ছিলেন আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং একনিষ্ঠ মুসলিম। ইরশাদ হয়েছে-

مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ [آل عمران : ٦٧]

অর্থ, ইবরাহীম ইহুদিও না এবং খ্রিস্টানও নয়; মিডিয়া তিনি তো একনিষ্ঠ রাজনীতি করলেন। তিনি কখনও শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।-সূরা আলে ইমরান : ৬৭

অন্যত্র আরও ইরশাদ হয়েছে-

وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ [البقرة : ١٣٢]

অর্থ, ইবরাহীম তাঁর সন্তানদেরকে এ কথারই অসিয়ত করলেন এবং ইয়াকুবও (তাঁর সন্তানদেরকে) যে, হে আমার পুত্রগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দ্বীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমাদের মৃত্যু যেন এ অবস্থায়ই আসে, যখন তোমরা মুসলিম থাকবে। -সূরা বাকারা (২): ১৩২

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের উম্মতসমূহের মধ্যে যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তারা সকলেই মুসলিম ছিলেন। মুসলিম অর্থ আত্মসমর্পণকারী। কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের নাম মুসলিম ছিল না। আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে কেবল এই উম্মতের নামই মুসলিম রেখেছেন।

যখন তিনি ইরাক থেকে হিজরত করে ফিলিস্তিনে আসেন, তখন ছিল হেকসোসদের শাসনামল। তারা মূর্তিপূজারি হলেও ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। তারা ইবরাহীম আ.কে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ দেয়। এখানেই হযরত ইসমাঈল আ.এর জন্ম। এ হিসেবে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ফিলিস্তিনের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক। ইসমাঈল আ.এর জন্মের ১৩ বছর পর ইসহাক আ. জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াকুব আ.। ফিলিস্তিনের ইতিহাসে তিনি তাৎপর্যের অধিকারী। ইবরাহীম আ.-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াকুব আ. জন্মগ্রহণ করেন। একসময় ইয়াকুব আ. হিজরত করে বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল “হাররানে” চলে যান। সেখানে তার এগার সন্তানের জন্ম। পরে আবার তিনি ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। ইয়াকুব আ.-এর আরেক নাম ইসরাইল (হিবরু ভাষায় যার অর্থ, আল্লাহর বান্দা)। সেই হিসেবে তার বংশধরদেরকে বনী ইসরাইল বলা হয়। ইউসুফ আ. একসময় ইয়াকুব আ.-কে সপরিবারে মিশরে নিয়ে যান। ইউসুফ আ. ও তাঁর ভাইয়েরা প্রায় ১৫০ বছর মিশরে বসবাস করেন। সেটা ছিল হেকসোসদের আমল। এরপরে “ফারাও” সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট আহমোসের কাছে হেকসোসরা পরাজিত হয়। ফারাওরা বনী ইসরাইলকে মনে করত হেকসোসদের সহযোগী। তাই বনী ইসরাইলের ওপর নেমে আসে প্রচণ্ড জুলুম-নির্যাতন। এ নির্মমতা চলে ৩ শ বছর পর্যন্ত।

মূসা আ. এর আগমন:

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ সালের দিকে তাদের মাঝে মূসা আ. প্রেরিত হন। তার আগে জন্ম হয় হারুন আ.-এর। নানান জুলুম-নির্যাতন অতিক্রম করে, ফেরাউনের লোহিত সাগরে সলিল সমাধির মধ্য দিয়ে বনী ইসরাইল মিশর ত্যাগ করে “সিনাই” উপত্যকায় আসে। সেখানে তারা নানান বিশৃঙ্খলা করে নবী মূসা ও হারুন আ. কে যারপরনাই কষ্ট দেয়। একপর্যায়ে তারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। শহর রক্ষা প্রাচীরের কাছে যাত্রাবিরতি দেয়। বিরতির পর মূসা আ. তাদেরকে শহরে প্রবেশ করতে বললে তারা এই বলে অস্বীকৃতি জানায় যে, এখানে এক পরাক্রমশালী জাতির বাস। সে সময়ের তাদের কিছু বক্তব্য আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরায়ে মায়িদাহ ২০ নং আয়াত থেকে ২৬ নং আয়াতে তুলে ধরেছেন। মোটকথা, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার শাস্তিস্বরূপ তারা “তীহ” প্রান্তরে ঘুরতে থাকে। এসময়ে মূসা আ.-এর ইন্তেকাল হয়। তাঁর ইন্তেকালের ১০ বছর পর ইউশা আ. বনী ইসরাইলকে নিয়ে ফিলিস্তিনে প্রবেশ করেন। তার জীবদ্দশাতেও বনী ইসরাইল অনেক বিশৃঙ্খলা করে। ইউশা আ. এর ইন্তেকালের পর ১৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়। এসময়ের মধ্যে তাদের অবাধ্যতা চরমে পৌঁছে। পৌত্তলিকতা তাদের ওপর চেপে বসে। তাদের প্রিয় “তাবুত” যার মধ্যে মূসা আ. এর লাঠি ছাড়াও অন্য আরও পবিত্র বস্তু ছিল তারা হারিয়ে ফেলে। নানান ঘটনার পর “তালুত” এর নেতৃত্বে জিহাদে অংশগ্রহণ করে। সে যুদ্ধে দাউদ আ. ও ১৬ বছর বয়সে অংশগ্রহণ করে জালেম শাসক “জালুত” কে হত্যা করেন। স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তিনি জালুতের ওপর বিজয় লাভ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ১০০৪ ঈসাব্দে দাউদ আ. আলকুদস শহরে প্রবেশ করেন। তিনি সবচেয়ে বড় ইহুদি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তা ছিল ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৭৪% অঞ্চল। এটাই ছিল ফিলিস্তিনে ঈমান ও আহলে ঈমানের প্রথম আধিপত্য। তাঁর ইন্তেকালের পর সুলাইমান আ. উত্তরাধিকারী হন। তিনি দাপটের সঙ্গে শাসন করেন। তাঁর প্রভাবের সামনে বনী ইসরাইল মাথা নুইয়ে রাখলেও তাঁর ইন্তেকালের পরপরই ইহুদিরা পুরোনো চরিত্রে ফিরে যায়। সুলাইমান আ.-ও ৪০ বছর শাসন করেন। তিনি বাইতুল মাকদিস পুনর্নির্মাণ করেন। ইহুদিরা ওখানে সুলাইমানী ট্যাম্পল থাকার কথা দাবি করে, কিন্তু নানান অনুসন্ধান করেও তার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।

বনী ইসরাইলের ছিল ১২টি গোত্র। সুলাইমান আ.-এর ইন্তেকালের পর তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে। একজনের নেতৃত্বে ১০ গোত্র একত্রিত হয়। বাকি দুই গোত্র একত্রিত হয় অন্য একজনের নেতৃত্বে। ১০ গোত্র ফিলিস্তিনের উত্তরে গড়ে তোলে ইসরাইলী সাম্রাজ্য। অন্য দুই গোত্র দক্ষিণ ফিলিস্তিনে গড়ে তোলে ইয়াহুযা সাম্রাজ্য। এরা ছিল ইয়াহুয়া ও বিনইয়ামিনের বংশধর। বিশৃঙ্খলা ও পৌত্তলিকতায় উভয় সাম্রাজ্যই বরাবর ছিল। সেই ইসরাইলী সাম্রাজ্য ২০২ বছর টিকে ছিল। একপর্যায়ে তারা অ্যাসিরিয়ানদের হাতে পরাজিত হয়। অ্যাসিরিয়ানরা ছিল ইরাকের অধিবাসী। খ্রিস্টপূর্ব ৭২১ এ তারা ইসরাইলী সাম্রাজ্যে হামলা করে। তারা সবকিছু তছনছ করে দেয়। অধিকাংশকে বন্দি করে পৃথিবীর নানান প্রান্তে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। এভাবে ইহুদিদের ১০ গোত্র ইতিহাস থেকে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইয়াহুযা সাম্রাজ্য আরও ১৫০ বছর টিকে ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ সালে আল্লাহ তাদের ওপর আবার ধ্বংসলীলা চাপিয়ে দেন। ইরাকের সেনাপতি বখতে নসর ফিলিস্তিন আক্রমণ করে ইহুদিদের তছনছ করে দেয়। মসজিদে আকসা ধ্বংস করে দেয়। ৪০ হাজার ইহুদিকে বন্দি করে ইরাকে নিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ইহুদি শাসনের অবসান ঘটে। যা সর্বমোট ৪১৮ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ইয়াহুয়া সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনে ব্যাবিলন শাসনের সূচনা হয়। এ শাসন খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ থেকে ৫৩৯ পর্যন্ত ৪৭ বছর স্থায়ী হয়। তখন পারসিক ও ব্যাবিলনদের মাঝে দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ ছিল চরম পর্যায়ে। ইহুদিরা সাইরাসের নেতৃত্বে থাকা পারসিকদের সহায়তা করলে ব্যাবিলনীরা পরাজয় বরণ করে। ফিলিস্তিন চলে যায় পারসিকদের দখলে। পারসিকরা ২০৭ বছর ফিলিস্তিন শাসন করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সালে রোমান সেনাপতি আলেকজান্ডার পারস্যকে পরাজিত করে। তারাও মুশরিক ছিল। ইহুদিরা তখন আলেকজান্ডারের অধীনে বসবাস করতে থাকে। রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সাল থেকে ৬৩ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন শাসন করে। রোমানরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর। বেশির ভাগ ইহুদি রোমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের সঙ্গে মিশে যায়। অল্প কিছু ইহুদি বিকৃত ধর্মের ওপর অটল থাকে।

ঈসা আ. এর আগমন

এরপর ঈসা আ. জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পর থেকে ৩০০ বছর পর্যন্ত ফিলিস্তিনে অল্প কিছু মানুষই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। ৩২৪ ঈসাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করায় গোটা রোমান সাম্রাজ্যেই খ্রিস্টধর্ম ব্যাপক প্রসার লাভ করে। পৌত্তলিকরাও দলে দলে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাদের চিন্তা-চেতনার প্রভাব খ্রিস্টধর্মেও পড়ে। যার ফলে খ্রিস্টধর্ম এক বিকৃত রূপ নিয়ে গোটা রোমান সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এসময় রোমানরা মসজিদে আকসার কাছেও যায়নি। ফিলিস্তিনে রোমান শাসন ৩১২ বছর স্থায়ী ছিল। একেবারে মুসলমানদের ফিলিস্তিন বিজয়ের আগ পর্যন্ত।

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন

৫৭০ ঈসাব্দে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। কিছুকাল তিনি মসজিদে আকসা অভিমুখে নামায আদায় করেন। নবুওত লাভের দ্বাদশ বছর ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে আকসায় সমস্ত নবীদের ইমামতি করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাঁকে যে খাতামুন্নাবিয়‍্যীন ও ইমামুল আম্বিয়া এবং সায়্যিদুল মুরসালীনও বানিয়েছেন, তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাইতুল মাকদিসে ইমামতির মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হল যে, তিনি সায়্যিদুল মুরসালীন, তিনি খাতামুন্নাবিয়্যীন। এই মসজিদে যত নবী ইমামতি করেছেন, মসজিদে আকসাতে দ্বীন-শরীয়তের যত তালীম হয়েছে, সব এখন ফিরে এসেছে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে। সবাইকে এখন তাঁরই অনুসরণ করতে হবে। তাঁকে যে কিতাব আল্লাহ তাআলা দান করেছেন, তা শিখতে হবে।

বাইতুল মাকদিসের প্রকৃত হকদার মুসলমানরা

বাইতুল মাকদিসের প্রকৃত হকদার তো নবীরাই ছিলেন। সকল নবী তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং সকল নবী আখেরী যামানার শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। কাজেই যারা তাওহীদে বিশ্বাসী এবং এই আখেরী নবী খাতামুন্নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী, তাঁর নবুওত ও খতমে নবুওতের প্রতি যাদের ঈমান রয়েছে, একমাত্র তারাই মসজিদে আকসার হক রাখে। যে মসজিদের মিম্বারে তাওহীদ এবং ঈমানের দাওয়াত উচ্চারিত হয়েছে, খাতামুন্নাবিয়্যীনের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারিত হয়েছে, সে মসজিদের মিম্বার আর মেহরাবের অধিকারী ঐ ইহুদি-খ্রিস্টানরা কখনো হতে পারে না, যারা তাওরাত ও ইঞ্জিলকে বিকৃত করেছে মূসা আ. ও ঈসা আ.-এর শরীয়তকে বিকৃত করেছে আল্লাহর নবীদের হত্যা করেছে, তাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, ঈসা আ.-এর ব্যাপারে কুফরী ও শিরকী আকীদা পোষণ করেছে। তারা যখনই তাদের নবীদের শরীয়ত বিকৃত করে ফেলেছে এবং শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পর তাঁকে নবী হিসেবে গ্রহণ করেনি, মানেনি, তাদের আর অধিকার থাকেনি। কীসের অধিকার তাদের? নিজেদের নবীদের কিতাব ও শরীয়ত বিকৃত করার পরই তারা বাইতুল মাকদিসের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। এরপর আখেরী নবীকে পাওয়ার পরও যখন তারা তাঁকে রাসূল হিসেবে গ্রহণ করেনি তখন আবার তাদের অধিকার থাকে কীভাবে?

হ্যাঁ, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রহণ করেছেন তারা সৌভাগ্যবান। তারা ‘খায়রে উম্মত’-এর মধ্যে শামিল আছেন।

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মনোযোগ

অষ্টম হিজরীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিলিস্তিন, দামেশক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শাসক শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানীর কাছে ঈমানের দাওয়াত দিয়ে পত্র পাঠান। শুরাহবিল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতকে হত্যা করে। পরিণামে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় মনোযোগী ছিলেন। ওফাতের এক মাস আগে তিনি উসামা ইবনে যায়েদ রা. এর নেতৃত্বে রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। নবীজীর ওফাতের কারণে এ বাহিনী অভিযানে বের হওয়া থেকে বিরত থাকে। খেলাফতের বাইআত সম্পন্ন হওয়ার পর আবু বকর রা. সর্বপ্রথম এ বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ করেন। ৩০ রবিউল আউয়াল ১২ হিজরীতে শাম জয়ের বিষয়ে পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। পরামর্শ সভায় শাম অভিযানের ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেন। শাম অভিযানের জন্য তিনি মুজাহিদ বাহিনী গঠনে মনোযোগী হন। আবু বকর রা.-এর খেলাফতকাল ছিল মাত্র ২ বছর ৬ মাস। এই অভিযান পূর্ণতা লাভের আগেই তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।

উমর রা. এর শাসনামলে রবিউল আখির ১৬ হিজরীতে আলকুদস শহর মুসলমানদের হস্তগত হয়। ১৯ হিজরীতে মুআবিয়া রা. এর হাতে কায়সারিয়া জয়ের মধ্য দিয়ে গোটা ফিলিস্তিন মুসলমানদের হাতে চলে আসে। মুসলমানদের আগমনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এখানে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ফিলিস্তিনে যারা বসাবাস করতো, তারা সবাই দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়। তখন সেখানে উল্লেখযোগ্য কোন ইহুদি ধর্মাবলম্বী ছিলো না। কারণ সবাইতো মুসলমান হয়ে যায়। আজ যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে নিজেদেরেকে ফিলিস্তিনের হকদার দাবি করছে তারা কারা? সুতরাং তাদের সেই দাবি সম্পূর্ণ অন্যায় ও মিথ্যা ছাড়া আর কিছু না। প্রায় পাঁচশ বছর মুসলমানদের হাতে ছিল বাইতুল মাকদিস। এরপর খ্রিস্টানরা এসে আবার এটা দখল করল। দখল করার সময় মুসলমানদের ব্যাপকহারে হত্যা করল। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি, মাত্র নব্বই বছরের মধ্যে আল্লাহ তাআলা আবার সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর মাধ্যমে বাইতুল মাকদিস দান করেছেন মুসলমানদের হাতে। এরপর হাজার বছরের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত ছিল মুসলমানদের হাতে। ১২৯৩ হিজরী থেকে ১৩২৮ হিজরী পর্যন্ত রাশিয়ায় চরম ইহুদি নির্যাতন হয়। তখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ফিলিস্তিনের তৎকালীন শাসক সুলতান আব্দুল হামীদকে রাশিয়া থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের গ্রহণ করতে বাধ্য করে। নানা কারণে তিনি শরণার্থী হিসেবে ইহুদিদের আশ্রয় দিতে মেনে নিতে বাধ্য হন। তবে তিনি এ ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলেন যে, ইহুদিরা কিছুতেই ফিলিস্তিনে স্থায়ী বসবাস করতে পারবে না। তবে একপর্যায়ে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। তখন সুলতান আব্দুল হামীদ সেই ঐতিহাসিক উক্তি করেন,’যতদিন উসমানী খেলাফত থাকবে, ততদিন ফিলিস্তিনে ইহুদিরা ঠাঁই পাবে না।’

১৯০৯ সালে ঐক্য ও প্রগতি সংঘ সুলতান আব্দুল হামীদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। নামকাওয়াস্তে খলীফার আসনে বসানো হয় পঞ্চম মুহাম্মাদকে। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে নিয়োজিত উসমানী সালতানাতের সেনাপতি মুস্তফা কামাল আতাতুর্ককে ফিলিস্তিন থেকে সরে যাওয়ার বিনিময়ে তুরস্কের সিংহাসনে বসানোর প্রলোভন দেয়। মুস্তফা কামাল সেই প্রলোভন ভালো করেই গলাধঃকরণ করে। এই বছরের ১৬ নভেম্বর বেলফোর ঘোষণার দুই সপ্তাহ পর ব্রিটিশ-বাহিনী

ফিলিস্তিন দখল করে। কথামতে কামাল তুর্কী বাহিনী নিয়ে ফিরে আসে। আরব-বাহিনী ছিল ব্রিটিশদের সহায়ক। তখন ফিলিস্তিনের বিপুল জনগোষ্ঠী কোথায় ছিল? আফসোস, তখন তারাও আরব জাতীয়তাবাদে বুঁদ হয়ে ছিল। তাদের মাথায় ঢোকানো হয়েছিল, ব্রিটিশরা এসে তাদেরকে উসমানীদের হাত থেকে রক্ষা করবে! তখন ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, ‘ইসলামী খ্রিস্টিয় যুব সংঘ’। ফিলিস্তিনীদের মগজ ধোলাইয়ে এদেরও জঘন্য ভূমিকা ছিল। এদের কাছে অনেকেই তখন প্রতারিত হয়েছিল। এরপর ১৯১৮-১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে চলে ইহুদিকরণ প্রকল্প। ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিরা ছিল ৮%। ১৯৪৮ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৩২%। তারা নানা ছলচাতুরি, প্রলোভন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জমি ক্রয় করতে শুরু করে। এত কিছুর পরও ইহুদিরা কেবল ১% জমি ক্রয় করতে পেরেছিল। ইহুদিরা ফিলিস্তিনের অর্থনীতিতে মারাত্মক আধিপত্য বিস্তার করে।

ফিলিস্তিনীদের মুক্তি-সংগ্রাম

ফিলিস্তিনীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র উভয় উপায়েই সংগ্রাম করেছে। স্বভাবতই প্রথম ধারার সংগ্রাম হয় ফলাফলশূন্য। শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম ছিল ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত। ১৯৩৩ সালে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র জিহাদের সূচনা হয়। নেতৃত্ব দেন সিরিয়ান নাগরিক ইযযুদ্দীন কাসসাম রাহ.। যার নামে গঠিত হয়েছে কাসসাম ব্রিগেড। এই জিহাদী কাফেলা দীর্ঘদিন গোপনে সুসংগঠিত হয়। তারপর সামরিক অভিযান শুরু করে। ইযযুদ্দীন কাসসাম রাহ.-এর শাহাদাতের পর নেতৃত্বে আসেন ফারহান সাদী। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। রোযা অবস্থায় তিনি শহীদ হন। এই মুজাহিদ বাহিনী ১৯৩৬ সালে ৫০৬টি কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করে। ১৯৩৮ সালে পরিচালনা করে ৫৭০৮টি। ১৯৩৯ সালে করে ৩৩১৫টি। ৩৭ থেকে ৩৯ সাল পর্যন্ত মুজাহিদদের হাতে ১০ হাজার ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারায়। ফিলিস্তিনী শহীদ হন ১২ হাজার। বন্দি হয় ৫০ হাজার। এমন প্রতিরোধের মুখে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন দুই ভাগ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ওয়াদা দেয়। এ ওয়াদা ছিল শুধুই প্রতারণা। এ ওয়াদায় প্রতারিত হয় মুসলমানেরা। স্তিমিত হয়ে যায় জিহাদী আন্দোলন।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইহুদি নির্যাতনের অজুহাতে ফিলিস্তিন অভিমুখে আবার ইহুদিদের ঢল নামে। এসময় ৯০ হাজারেরও বেশি ইহুদি ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো রাষ্ট্র না থাকা সত্ত্বেও ইহুদিরা জাতিসংঘে নিজেদের নামে প্রতিরক্ষা ইউনিট তৈরি করে।

এদিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলে আমেরিকা পরাশক্তি হিসেবে উত্থানের জানান দেয়। গ্রেট ব্রিটেনের সূর্য তখন অন্তগামী। ইহুদিরা এ সময়ে ব্রিটেনকে ত্যাগ করে আমেরিকার কোলে আশ্রয় নেয়। ব্রিটেনকে ত্যাগ করতে গিয়ে ইহুদিরা তাদের চিরাচরিত স্বভাব খেয়ানতেরই পরিচয় দেয়। ১৯৪৬ সালে ইঙ্গ-মার্কিন জোট গঠিত হয়। তারা তিনটি দাবি উত্থাপন করে: ১. এক লক্ষ ইহুদিকে ফিলিস্তিনে আশ্রয় দিতে হবে। ২. ফিলিস্তিনে সবার জন্য জমি কেনা উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ৩. ফিলিস্তিনে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সরকার গঠন করতে হবে।

আরবদের প্রতিবাদের মুখে বিষয়টি জাতিসংঘের দায়িত্বে দেওয়া হয়। জাতিসংঘ দুই রাষ্ট্রের প্রস্তাব দেয়। ইহুদিরা ৩২% হয়েও তারা পাবে ফিলিস্তিনের ৫৬.৫% পার্সেন্ট, ফিলিস্তিনিরা পাবে ৪৩%। বাকি ০.৫% আলকুদস ভূখণ্ড। যা আন্তর্জাতিক অঞ্চল। ১৯৪৭ সালে বিভক্তির এ প্রস্তাব কার্যকর হয়। আরব লীগ দ্রুত বৈঠকে বসে। কয়েকটি আরব দেশ মিলে স্যালভেশন আর্মি গঠন করে। নেতৃত্ব দেওয়া হয় সন্দেহজনক এক ব্যক্তি ফাওজী কাউকজীকে। এক মিলিয়ন পাউন্ড বাজেট করা হয়। দামেশকের কাতনায় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়।

এ সংবাদ শুনে ব্রিটেন আরবলীগের কাছে এ মর্মে বার্তা পাঠায়, ‘ফিলিস্তিনীদের প্রশিক্ষণ, সশস্ত্রীকরণ ব্রিটেন বন্ধুত্ব পরিপন্থি মনে করে।’ এতেই আরবলীগ ক্যাম্প বন্ধ করে দেয়। স্বেচ্ছাসেবকদের বের করে দেয়। স্যালভেশন আর্মির সংখ্যা ৭৭০০ তে নামিয়ে আনে। অথচ ইহুদি সশস্ত্র সংগঠন এক হাগানারই সদস্য সংখ্যা ছিল তখন ৬২ হাজার! আরবলীগের এমন সিদ্ধান্তে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, ১৯৪৫ সালে আরবলীগের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ব্রিটেনের ইন্ধনে।

তখন আব্দুল কাদের হুসাইনীর নেতৃত্বে ফিলিস্তিনের গণআন্দোলনের সৃষ্টি হয়। আন্দোলন মুসলিম বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম দেশগুলো ব্রিটিশ আগ্রাসনের মুখে থাকার দরুন আন্দোলন তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। কেবলমাত্র ইখওয়ানুল মুসলিমীন সক্রিয়ভাবে ফিলিস্তিন জিহাদে অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৮ সালের ৩ এপ্রিল আলকান্তাল শহর অবরোধের সময় আরবলীগের কাছে অস্ত্র চাওয়া হলে কোনো সাড়া মেলেনি। ব্রিটিশ-বাহিনী ফিলিস্তিন ছাড়ার আগ পর্যন্ত আরব-বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর একের পর এক শহর ইহুদিদের হাতে পতন হতে থাকে। ১৫ জুলাই ১৯৪৮ সালে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৬ দিনের মাথায় জাতিসংঘ শান্তির আহ্বান জানায়। আরব দেশগুলো প্রতারণাপূর্ণ শান্তি প্রস্তাবের ফাঁদে পা দেয়। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ইহুদিদের অনুকূলে চলে যায়। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আসেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব ফোক বার্নাডট। তিনি ১৯৪৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরলে ১৭ সেপ্টেম্বর ইহুদিরা তাঁকে হত্যা করে। আরব-বাহিনী মুজাহিদদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়। দেশে পৌঁছতেই নিরাপত্তাবাহিনী তাদেরকে গ্রেফতার করে। আরব-বাহিনী সেসব এলাকাতেই অভিযান চালায়, যেগুলো জাতিসংঘ ইসরাইলের ভাগে দিয়েছিল।

আরব-বাহিনী সেসব এলাকা থেকে মুজাহিদদের হটিয়ে ইহুদিদের জন্য দখল করার পথ সুগম করে দিত। ৭ লক্ষ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনীকে বিভিন্ন আরব দেশে বিতাড়িত করা হয়। ইখওয়ানের প্রধান হাসানুল বান্নাকে গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে শহীদ করা হয়। এভাবেই আরব-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির আয়োজন করা হয়। ১৯৪৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি ইহুদিরা মিশরের সাথে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব করে। ২৩ মার্চ লেবাননের সাথে চুক্তি হয়। ৪ এপ্রিল হয় জর্ডানের সাথে। সিরিয়ার সাথে চুক্তি হয় একই বছরের ১ এপ্রিলের পরে। ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ২২% ভূখণ্ড মিশর ও জর্ডানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। জর্ডানের ভাগে যায় পশ্চিম তীর। গাজায় আধিপত্য বিস্তার করে মিশর। আরব-ইসারাইলের এ সন্ধির পর জাতিসংঘ ইসরাইলকে সদস্যপদ দেয়। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ একের পর এক জায়নবাদী এ রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দিতে থাকে।

Scroll to Top